রাজশাহী সংবাদদাতাঃ
রাজশাহীর পদ্মা নদীতে এখন আর আগের মতো দেশি প্রজাতির মাছ মিলছে না। বিশাল এই নদীর বুকে কমেছে পানির প্রবাহ ও গভীরতা, বেড়েছে চর ও বালুর আধিক্য। নদীতে মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইলিশের পাশাপাশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে দেশীয় মাছের বহু প্রজাতি। এর প্রভাব পড়েছে নদীনির্ভর জেলেদের জীবন-জীবিকাতেও।
জানা যায়, একসময় রাজশাহীর পদ্মায় ছিল মাছের প্রাচুর্য। গোদাগাড়ী থেকে চারঘাট পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়ত ইলিশ, বাঘাইড়সহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। বিশেষ করে গোদাগাড়ীর পদ্মায় একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়া যেত। আকারেও মিলত মাঝারি থেকে বড় ইলিশ। কিন্তু সেই সময় এখন পাল্টেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গোদাগাড়ী উপজেলার রেলওয়ে বাজার, মৎস্য আড়ৎ ও পদ্মা নদীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, নদীর মাছের উপস্থিতি খুবই কম। সামান্য কিছু নদীর মাছ থাকলেও অধিকাংশ মাছই পুকুরে চাষ করা কাতল, রুই, তেলাপিয়া, কৈ ও পাবদা। জেলেরা এসব মাছ সারিবদ্ধভাবে রেখে দেন। পরে আড়তের মালিকরা সেগুলো পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।
নদীর মাছ কমে যাওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ক্রেতাও এখন আর আগের মতো মাছ কিনতে আসছেন না। বাজারে প্রতি কেজি পাঙ্গাস মাছের দাম পড়ছে প্রায় ৪০০-৮০০ টাকা। বাঘাইড় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ১০২০ টাকা দরে।
শুধু নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়াই নয়, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও দেশীয় মাছের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। বর্ষায় এসব জমি, পুকুর ও ডোবার পানি নদীতে মিশে মাছের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের জেলে হবি, দুরুল বলেন, বাপ-দাদার সময় থেকে এ পেশায় জড়িয়ে থাকলেও এখন আর পোষাচ্ছে না। তিনি বলেন, শৈশব থেকেই পদ্মায় মাছ শিকার করছি। আগে যেখানে কয়েক মণ মাছ পেতাম, এখন তা কেজিতে নেমে এসেছে। ফলে সংসার চালাতে পারছি না। হয়তো অচিরেই এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন কোনো কাজ করতে হবে। ইতোমধ্যেই অনেকেই মাছ শিকার ছেড়ে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মায় দেশীয় ৭৭ প্রজাতির মাছের মধ্যে তিনটি প্রজাতির অবস্থা সংকটজনকভাবে বিপন্ন, ১০টি প্রজাতি বিপন্ন, নয়টি প্রজাতি অতি বিপন্ন এবং আরও নয়টি প্রজাতি বিপন্ন প্রায় অবস্থায় রয়েছে। পদ্মা থেকে হারিয়ে যাওয়া মৎস্য প্রজাতির ৬০ শতাংশই এখন বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। অর্থাৎ নদীর পানি কমে যাওয়া, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্য সংকট, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে একের পর এক দেশীয় মাছের প্রজাতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব, নদীতে পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে যাওয়া, প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং কৃষিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ নানা কারণে পদ্মার মাছের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে গেছে।
গবেষকরা বলছেন, পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় স্রোতও কমেছে। ফলে এখন ইলিশ সেভাবে নিচু এলাকা থেকে উজানে আসে না। বিশেষত নদীতে পানির গভীরতা কমে যাওয়া, বাঁধ দেওয়া এবং ফিল্টারেশন বেশি হওয়ারÑঅর্থাৎ ড্রেজিংয়ের কারণে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ারÑকারণে ইলিশের আগমন কমে গেছে।
গবেষকদের মতে, পানির গভীরতা ২০ থেকে ২৫ ফুট না হলে ইলিশ নদীতে আসতে চায় না। পদ্মায় পানির গভীরতা ও স্বাভাবিক স্রোত কমে যাওয়ায় ইলিশের উজানে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫০৭ টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৩৫ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৪১ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৮১ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯২ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৭৩ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ আরও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য অধিদপ্তর রাজশাহী জেলার তথ্যমতে, পদ্মা নদী থেকে ২০২৪-২৫ অথবছরে দেশীয় মাছ আহরণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৬২০ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশীয় মাছ আহরণ হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৪০ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে হয়েছিল ২ হাজার ১৫২ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ২২১ টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে আহরণ হয়েছিল ২ হাজার ২৮৩ টন। অর্থাৎ প্রতিবছরই দেশীয় মাছের আহরণ কমছে। গত পাঁচ বছরে মাছ আহরণ কমেছে ৪৩৩ টন। তবে অর্থবছর শেষ না হওয়ার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজশাহীর পদ্মা নদী থেকে মাছ আহরণসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ইলিশ দ্রুত বেগে ছোটে এবং উজানের দিকে যেতে পছন্দ করে। এ মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে চলাচল করে। পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে উজানে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত ইলিশ যেত এবং ডিম ছাড়ত। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর রাজশাহীতে ইলিশ কমতে থাকে। বাঁধের কারণে পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় স্রোতও কমে গেছে। ফলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যেত। তবে আশির দশক থেকেই পদ্মায় ইলিশের পরিমাণ কমতে থাকে।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইলিশ এমন একটি মাছ, যেটি সমুদ্র এবং নদীÑউভয় জায়গায় বিচরণ করে। ইলিশের যৌবনপ্রাপ্তির জন্য সমুদ্রে বসবাস করতে হয়। আর ডিম ছাড়ার জন্য মাছটি নদীতে আসে। ইলিশ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে ডিম দিতে পারে না। ডিম দিলেও নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য স্বাদু পানি প্রয়োজন। স্বাদু পানিতে ডিম দিলে তা নষ্ট হয় না। এছাড়া যত বেশি উজানে যাবে, তত বেশি ডিম থেকে ইলিশ পাওয়ার হারও বাড়বে। ফলে নদীতে পর্যাপ্ত পানি ও স্বাভাবিক স্রোত না থাকলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃ/স/জয়