কৃষি সময় ডেস্কঃ পিরোজপুরে অন্তত ৫০ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। নদী-নালার নাব্যতা কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং কৃষিজমির রাসায়নিক দূষণে মাছের বংশ ধ্বংস হতে চলেছে। জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জেলেদের জীবিকায় এর প্রভাব পড়েছে ।
জানা যায়,নদীমাতৃক পিরোজপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ২২টি নদ-নদী। বলেশ্বর, কচা, সন্ধ্যা ও কালীগঙ্গা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব নদী, খাল ও বিলে একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্য থাকলেও এখন উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির দেশি মাছ। স্থানীয় বাজারগুলোতে এখন আর দেশি মাছ দেখা যায় না।
অথচ এক দশক আগেও স্থানীয় নদী ও বিলের মাছের আধিপত্য ছিল বাজারে। এখন মাঝেমধ্যে সামান্য টাকি, পুঁটি, বাইলা, টেংরা, বেতরঙ্গি, গুলশা, শোল, ফলি, বাইন, বোয়াল, আইড় ও দেশি চিংড়ি পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।
জেলার বড় বাজার পিরোজপুর শহর ছাড়াও জিয়ানগর, নাজিরপুর, কাউখালী, ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ ও মঠবাড়িয়ার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি মাছ মিলছে খুবই সীমিত পরিসরে। অন্যদিকে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, থাই কই, সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, গলদা চিংড়ি, রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুর ও শিংসহ বিভিন্ন চাষের মাছ বাজার দখল করে নিয়েছে।
মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার মতো পিরোজপুরেও অন্তত ৫০ প্রজাতির দেশি মাছ এখন সংকটাপন্ন। এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে- প্রজনন মৌসুমে চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মা মাছ ও রেণুপোনা নির্বিচারে ধরা হচ্ছে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে জলাশয়ে মিশে মাছ ও পোনা ধ্বংস করছে। শীতকালে বিলের পানি সম্পূর্ণ সেচে মাছ ধরার কারণে পরবর্তী মৌসুমের জন্যও মাছের প্রাকৃতিক মজুত নষ্ট হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগের ভাষ্য, অপরিকল্পিত সড়ক, বঙ্ কালভার্ট, স্লুইসগেট ও আবাসন নির্মাণের কারণে নদী-খালের স্বাভাবিক সংযোগ নষ্ট হয়েছে। আগে বর্ষায় নদীর মাছ বিল ও ছোট খালে গিয়ে ডিম ছাড়ত। এখন সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নতুন মাছের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।
মাছের সংকটে জেলার বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকার বহু জেলে পরিবার ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্যামত বলেন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে জেলা ও উপজেলা মৎস্য দপ্তর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় নিয়মিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, পরিবহন ও বিক্রির দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলেপাড়া ও ঘাটে সচেতনতামূলক সভা, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে দেশি মাছ রক্ষা সম্ভব নয়। নদী-খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশি মাছ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃ/স/জয়