কৃষি সময়
প্রকাশ : Aug 3, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কোল্ড স্টোরেজে বিদ্যুতের বিল বাড়ায় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে কৃষকের ঘাড়ে

স্টাফ রিপোর্টারঃ নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় দেশের কোল্প স্টোরেজ গুলোতেও বিদ্যুৎ বিল বেশি আসতে শুরু করেছে। এতে স্টোরেজ মালিকদের আগের তুলনায় বেশি বিল দিতে হচ্ছে। কিন্তু হিমাগারে আলু রাখা হচ্ছে পূর্ব নিধাররিত মূল্যে। এমন অবস্থায় মালিকপক্ষের দাবী সমন্বয়করে নতুন মূল্যে নির্ধারণ এবং সরকারিভাবে হিমাগার খাতে প্রণোদনার।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে হিমাগার রয়েছে ৪০২টি। আর অ-হিমায়িত মডেল ঘর রয়েছে ৭০৩টি। সেসব হিমাগার ও অ-হিমায়িত মডেল ঘরে চলতি মৌসুমে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা এ মৌসুমে উৎপাদিত মোট আলুর ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাওয়ার জন্য ও ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। চলতি বছর দেশে আরো ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। যা সংরক্ষণে কোল্ড স্টোরেজ একমাত্র ভরসা।

গত বছর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এসব হিমাগারে আলু সংরক্ষণ বাবদ প্রতি কেজির ভাড়া নির্ধারণ করেছিল ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। যেটি এ মৌসুমে কার্যকর রয়েছে। যেটিকে বেশি বলছেন কৃষকরা। তবে হিমাগার মালিকরা বলছেন, এ মূল্যেও তারা এখন লোকসান গুনছেন। এর উপর নতুন করে যোগ হয়েছে সরকারের বাড়তি বিদ্যুতের দাম। 

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছে, ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি হিমাগারে ব্যাংকের সুদসহ কিস্তি এবং নতুন বর্ধিত বিদ্যুতের দাম ধরলে প্রতি কেজি আলুর পেছনে তাদের ব্যয় হয় ৭ টাকা ১১ পয়সা। এর সঙ্গে কর্মীদের বেতন-ভাতা, অ্যামোনিয়া গ্যাস, লুব্রিক্যান্টসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ ও ‘যৌক্তিক লভ্যাংশ’ হিসাব করলে কেজিপ্রতি হিমাগার ভাড়া ৯ টাকা ৬২ পয়সা হওয়া উচিত। যদিও তারা যৌক্তিক মূল্য হিসেবে ৬ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) জানিয়েছে, জুনে কার্যকর হওয়া নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে কোল্ড স্টোরেজের বিদ্যুৎ ব্যয় গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। আগে অফ-পিক আওয়ারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ১৩ টাকা ৬২ পয়সা, যা বেড়ে হয়েছে ১৬ টাকা ৬ পয়সা। আর পিক আওয়ারে প্রতি ইউনিটের দাম ৯ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৫৬ পয়সায়।

রংপুরের ফয়জুন নাহার হিমাগার লিমিটেডের মে মাসের বিদ্যুৎ বিল ছিল ১০ লাখ ৪৬ হাজার ১৪২ টাকা। পরের মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৫ হাজার ৫৫১ টাকায়।

কেবল ফয়জুন নাহার হিমাগার নয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের প্রায় সব হিমাগারের ওপরই পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ পরিস্থিতির বিপরীতে আলুচাষীরা হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ফলে তারা ভাড়া কমানোর দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করছেন হিমাগার মালিকরা।

তাদের মতে, নতুন বাস্তবতার আলোকে হিমাগারের ‘যৌক্তিক’ ভাড়া পুনর্র্নিধারণ করা জরুরি। তবে দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং আলুচাষী ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া বাড়ানোও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন তারা। এ কারণে হিমাগার খাত টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুতের দামে বিশেষ ছাড় বা প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন মালিকরা। অন্যথায় অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপরই গিয়ে পড়বে, যা তাদের লোকসান আরো বাড়িয়ে দেবে।

এ বিষয়ে বিসিএসএ সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘সুদসহ ব্যাংকের কিস্তি ও বিদ্যুৎ বাবদ প্রতি কেজি আলুর পেছনে আমাদের ব্যয় ৭ টাকা ১১ পয়সা। শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ হিসাব করলে প্রতি কেজিতে সেটি দাঁড়ায় ৯ টাকা ৬২ পয়সা। এমন পরিস্থিতিতে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের লোকসান ও দেশের আর্থিক প্রেক্ষাপটে ভাড়া বাড়াতে পারছি না। নিজেরাও লোকসান টানতে পারছি না। এজন্য অন্যান্য কৃষি শিল্পের মতো আমাদেরও বিদ্যুতে রিবেট (ছাড়) দিতে হবে এবং কৃষককে সহযোগিতা করতে হবে। অন্যথায় হিমাগার মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তারা হিমাগার বন্ধ করে দিলে কৃষকরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

সংকট সমাধানে তিনি কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষীকে সরকারি প্রণোদনা দিতে হবে। হিমাগারের জন্য বিদ্যুতে রিবেট, হিমাগারকে কৃষিভিত্তিক শিল্প ঘোষণা করে হিমাগার স্থাপন ও পরিচালনা ব্যয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। সেই বরাদ্দে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে হিমাগার স্থাপন ও পরিচালনা ব্যয়ের জন্য ঋণ প্রদান করতে হবে। উদ্বৃত্ত আলু রফতানিকে উৎসাহিত করতে ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান, হিমাগারের দেয়া ঋণের কিস্তি ত্রৈমাসিকের পরিবর্তে বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখার মতো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’

এদিকে গত দুই বছর ধরে আলুতে লোকসান গুনছেন কৃষকরা। গত মৌসুমে লোকসানের কারণে হিমাগার থেকে দুই লাখ টন আলু কৃষক নেননি বলে জানিয়েছে হিমাগার অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির হিসাবে, আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় কেজিতে ১৪ থেকে ১৬ টাকা। এরপর হিমাগার ভাড়া, পরিবহন, বস্তাসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে সেটি ২৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। অথচ কৃষকরা হিমাগার গেটে ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি করছেন।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের তালুক গ্রামের আলুচাষী আব্দুর রহিম বলেন, ‘নিজের চাষ ও কিনে চার হাজার বস্তা (৬৫ কেজিতে বস্তা) আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। এর মধ্যে ১৫ ও ১৬ টাকা কেজি দরে দুই হাজার বস্তা বিক্রি করেছি। অথচ প্রতি কেজি আলুতে উৎপাদন, হিমাগারসহ অন্যান্য মিলিয়ে ২৩ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ মুহূর্তে আলু বিক্রি করলে প্রতি কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা লোকসান হবে। গত বছরেও লোকসান হয়েছিল।’

বদরগঞ্জ উপজেলার শাহজালাল হিমাগারের ম্যানেজার সুভাস মুখার্জি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি আলুর হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। আমরা এবারো সেটাই নিচ্ছি। হিমাগার গেটে ডায়মন্ড ও স্টারিক জাতের আলু প্রতি কেজি ১৬ থেকে ১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টিপিএস জাতের বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষদিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি আলুর পাইকারি দাম ছিল ১৮ থেকে ২১ টাকা। বিপরীতে একই দিন খুচরা দাম ছিল ২৫ থেকে ২৮ টাকা। একই দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে প্রতি কেজি আলুর খুচরা মূল্য ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। ফলে কৃষকের লোকসানের পাল্লা ভারীই হচ্ছে। এ অবস্থায় হিমাগারের খরচ কমিয়ে আনা এবং কৃষককে প্রণোদনা দেয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ‘বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। সরকার সবসময়ই কৃষিকে অগ্রাধিকার দেয়। হিমাগারে আলু রাখার খরচটি সরকার, কৃষক, হিমাগার মালিকÑএদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ হয়। আগামী মৌসুমের আগেই হয়তো আমরা কৃষক প্রতিনিধি ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে বসে আলাপের মাধ্যমে একটা সমাধানে আসব। যাতে কৃষকও বাঁচেন, হিমাগার মালিকরাও বাঁচেন।’

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাধ্যতামূলক অবসরে সচিব মিয়ান কৃষিতে রেখে গেছেন নিজস্ব বলয়

1

পশ্চিমাঞ্চলে পাটের বাজার চাঙ্গা

2

হিলিতে শুকনো মরিচের দাম বেড়েছে

3

মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, এর অবিচ্ছেদ্য অংশ : রিজওয়ানা হাসান

4

কচুরিপানায় হুমকিতে নদীর প্রাণ ও মৎস্যসম্পদ

5

ফুলবাড়ীতে মাল্টার বাম্পার ফলন

6

১৫ বছর ধরে জলাবদ্ধ ৮শ’ বিঘা জমি

7

সমুদ্রে ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বেড়েছে

8

গুচ্ছের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চূড়ান্ত ভর্তির সময় বাড়ল

9

ভাসমান পেয়ারার বাজার দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত

10

শাপলা ফুলে জীবিকা নির্বাহ

11

জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বারোপ

12

চা বাগান থেকে দুই অজগর উদ্ধার

13

বন্যাকবলিত পশুর সেবায় ছুটছেন ফেরদৌসী

14

মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ডক্টর জেড করিমকে সংবর্ধনা

15

দাম নেইঃ পানের বরজ ভাঙছেন চাষী

16

আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদন নিশ্চিত

17

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

18

দেশের বৃহত্তম ভাসমান হাট বৈঠাকাটা

19

বাকৃবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি রফিকুল সম্পাদক আসাদুজ্

20