স্টাফ রিপোর্টারঃ দেশে ক্রমেই শিং মাছের চাষাবাদ লাভ জনক হয়ে উঠেছে। অল্প পুঁজি,কম জায়গায় বেশি লাভ হওয়ায় চাষীরা বাণিজ্যিকভাবে এই মাছ চাষাবাদে ঝুঁকছেন।
জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলা গ্রামের মাছ চাষিরা দেশি শিং মাছ চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের ছোট একটি পুকুরে শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাস অন্তর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা।
এই মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি। অন্তত ৫০০ পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের। এছাড়া মাছ চাষ করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন ৬ জন মৎস্য চাষি।
দেশে শিং মাছের পোনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকা। সেখান থেকে মাছের পোনা ক্রয় করে নির্ধারিত পুকুর বা জলাশয়ে চাষ করছেন চাষিরা। এছাড়া কুমিল্লা, যশোর, নরসিংদী, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে শিং মাছ চাষ হচ্ছে।
চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে দেশি শিং মাছ চাষ করে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আর মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে, সেক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা পেয়ে থাকেন।
ত্রিশাল উপজেলার ধলা গ্রামের আজিম উদ্দিন একজন মাছ চাষি। এ চাষাবাদের মাধ্যমে তিনি তার সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। এখন তার ৩০টি পুকুরে মাছ চাষ হয়।
তিনি জানান, এক শতক জায়গায় কার্প জাতীয় মাছ ৫০ থেকে ৬০টি চাষ করা যায়। অথচ অল্প জায়গায় শিং মাছ চাষ করে অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায়।
একই এলাকার আরেক মাছ চাষী অজিৎ বর্মণ জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছের পোনা সরবরাহ করেন। সারা দেশে অনেক জলাশয় খালি পড়ে থাকে। এসব জলাশয়ে অন্তত ৬ মাস শিং মাছ চাষ করলেও অনেক বেকার যুবক আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
ধলার মাছ চাষিদের তথ্যানুযায়ী, কোনো জলাশয়ে ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করলে কমপক্ষে ৪৮ হাজার শিং মাছ টিকে থাকে। ৬ মাস পর ৪৮ হাজার শিং মাছের ওজন হয় ১ হজার ৯২০ কেজি। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি শিং মাছের পাইকারি বিক্রয় মূল্য ৫০০ টাকা। এ হিসাবে ১ হজার ৯২০ কেজি মাছের বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এ এলাকার মাছ চাষিরা জানান, বর্তমান বাজারে ১ দশমিক ৫ বা ২ ইঞ্চির প্রতিটি শিং মাছের দাম ৩ টাকা। সে হিসাবে ৫০ হাজার শিং মাছের পোনার দাম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সঠিকভাবে খাবার ও যত্ন নিলে ৫ থেকে ৬ মাস পরে প্রতিটি শিং মাছের ওজন হয় ৪০ বা ৫০ গ্রাম অর্থাৎ ৬ মাস পর ২০ থেকে ২৫টি শিং মাছের ওজন হয় ১ কেজি।
এদিকে ৪৮ হাজার মাছের জন্য ৬ মাসে সর্বোচ্চ ৪ টন খাবার প্রয়োজন হয়। প্রতি টন মাছের খাবারে খুচরা মূল্য ৫০ হাজার টাকা হলে ৪ টন খাবার এর দাম পড়ে ২ লাখ টাকা। কোনো জলাশয়ে ৬ মাস ৪৮ হাজার শিং মাছ চাষ করলে শ্রমিক ও পরিবহন খরচবাবদ ব্যয় হতে পারে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদে ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, এক শতাংশ জায়গায় ১ হাজার শিং মাছ চাষ করা যায়। ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করার জন্য ৫০ শতাংশের একটি পুকুর বা জলাশয় প্রয়োজন হবে, যা থেকে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় সম্ভব।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর সাবেক পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর জানান,শিং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। এ মাছে ফ্যাট বা তেলের পরিমাণ কম এবং সহজপাচ্য উচ্চমানের প্রচুর আমিষ থাকায় সবার মধ্যে বিশেষ করে রোগীদের মধ্যে এ মাছের প্রচুর চাহিদা ও কদর রয়েছে।
তিনি বলেন, জিয়ল মাছের চাহিদা অন্য সব মাছের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি। সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষে বেশি লাভ হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক চাষি বিএফআরআই’র কারিগরি সহযোগিতায় শিং মাছের নিবিড় চাষ করে অধিক লাভবান হয়েছেন।
কৃ/স/জয়