*দীর্ঘদিন সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে রুটিন দায়িত্ব
*ধান গবেষণায় দায়িত্বে অতিরিক্ত সচিব, দুই মাসে অফিস করেছেন ৪ দিন
*কৃষি মন্ত্রণালয়ে এখনো ‘দুই সচিবের ভূত’, পদোন্নতি ও স্থায়ী নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ
বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং রপ্তানিমুখী কৃষি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের প্রায় সব প্রধান কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে রুটিন দায়িত্বে চলছে। ফলে গবেষণা পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি), যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক প্রায় দুই মাসে মাত্র চার দিন অফিস করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরও কৃষি মন্ত্রণালয়ে সাবেক দুই আলোচিত সচিবের গড়ে তোলা প্রশাসনিক বলয়ের প্রভাব এখনো কাটেনি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডসহ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দীর্ঘদিন ধরে রুটিন দায়িত্বে চলছে। সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থা ব্রিতে। গত ৩ মে ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া হলেও দুই দিনের মাথায় সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) আফসারী খানমকে প্রথমে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা এবং পরে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় দুই মাসে তিনি মাত্র চার দিন ব্রিতে গেছেন। সর্বশেষ ২৭ জুন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গাজীপুরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক ও গবেষণা নেতৃত্ব কার্যত অনুপস্থিত বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া পরিচালক (গবেষণা) ও পরিচালক (প্রশাসন) পদও রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) প্রায় দুই মাস মহাপরিচালকের পদ শূন্য থাকার পর গত ২৪ জুন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মঞ্জুরুল কাদিরকে রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে আরও পাঁচজন কর্মকর্তাকে পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের মতে নজিরবিহীন। দেশের কৃষি গবেষণার সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান বিএআরসিতেও দীর্ঘদিন নিয়মিত নির্বাহী চেয়ারম্যান নেই।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর ড. মো. আবদুছ ছালামকে নির্বাহী চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হলেও প্রায় আট মাস পরও তিনি গ্রেড-১ বা চলতি দায়িত্ব পাননি। ফলে তাকে একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিএআরসির একাধিক সদস্য পরিচালকও রুটিন দায়িত্বে রয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেও (ডিএই) একই চিত্র।
সংস্থাটির সর্বশেষ তিন মহাপরিচালক রুটিন দায়িত্ব পালন করেই অবসরে গেছেন। বর্তমান মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম গত ৭ জানুয়ারি রুটিন দায়িত্বে যোগ দিলেও এখনো চলতি দায়িত্ব পাননি। ফলে তিনি মহাপরিচালকের পাশাপাশি উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন। এতে পরিচালকের পদে নতুন পদোন্নতিও আটকে রয়েছে। পদোন্নতি ব্যবস্থাও স্থবির। প্রায় সাড়ে ছয় মাস আগে অতিরিক্ত পরিচালক পদে ২৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও এখনো তাঁদের পদায়ন হয়নি। একই সঙ্গে ২৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ। এতে মাঠ ও প্রশাসনিক পর্যায়ে শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না।
বিজেআরআইতে ২০২৪ সালের আগস্টে ড. নার্গীস আক্তারকে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রায় পৌনে দুই বছর ধরে তিনি একই দায়িত্বে রয়েছেন। বিনায় মহাপরিচালকসহ দুটি পরিচালক পদ এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী পরিচালকের পদও রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো সাবেক দুই সচিবের গড়ে তোলা বলয়ের প্রভাবমুক্ত হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয়া ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের বিরুদ্ধেও নিজস্ব প্রশাসনিক বলয় শক্তিশালী করার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরও সেই বলয়ের বড় অংশ এখনো মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোতে প্রভাব বিস্তার করছে। এর প্রভাব পড়ছে পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, কৃষি খাতে শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়, নীতিগত বৈষম্যও প্রকট হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, বীজ উৎপাদন, আইপিএম ও আইসিএম কার্যক্রম এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর দাবি, কৃষি খাতের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এখনো রুটিন দায়িত্বে চলছে। স্থায়ী নিয়োগ ও পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং অনেক যোগ্য কৃষিবিদ বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত স্থায়ী নেতৃত্ব নিয়োগ, প্রশাসনিক বৈষম্য দূর এবং গবেষণা-সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ব্রির বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। প্রথমে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হলেও তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আন্দোলন ও তালাবদ্ধ করার ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রুটিন দায়িত্বের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে। কোথাও মহাপরিচালক হতে দুই বছর, কোথাও তিন বছর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শর্ত রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলে এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) অনুমোদন মিললে স্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হবে।
২৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের পদোন্নতির প্রস্তাব ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে কৃষি সচিব বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পাওয়ার পর যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া হবে। অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়া ২৬ কর্মকর্তার পদায়ন নিয়ে দুটি মত রয়েছে। সরকার সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একবার পদোন্নতি কার্যকর হলে তা প্রত্যাহার করা কঠিন। তাই যারা বঞ্চিত হয়েছেন, শূন্য পদ সৃষ্টি হলে তাদেরও পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি দেয়া হবে।