বরিশাল প্রতিনিধিঃ বরিশালে পেঁপে চাষাবাদ ও চারা উৎপাদন করে আকাশ ছোঁয়া সাফল্য পেয়েছেন আবু বকর সিদ্দিকী সুমন নামে এক প্রবাসী কৃষি উদ্যোক্তা। শুন্য থেকে শুরু করে এ চাষাাবাদের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার ব্যবসা। প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছেন প্রায় ২ হাজার নতুন কৃষি উদ্যোক্তা। সফল এই উদ্যোক্তার বাড়ী বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা গ্রামে।
জানা যায়, সুমন প্রায় ২২ বছর প্রবাসে কর্ম জীবন কাটান। বিভিন্ন দেশ ভ্রমনের সুযোগে সময় জিম্বাবুয়ে ও মালাউইতে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হন। দেশে ফিরে নানা ব্যবসা বাণিজ্য করে ক্ষতিগ্রস্থ হন। ২০২১ সালে মাছ চাষের জন্য ঋণ নিতে গিয়ে তৎকালীন বাবুগঞ্জের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামানের পরামর্শে মাছের পাশাপাশি পেঁপে চাষ শুরু করেন। সরকারি একটি প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পান। প্রথমদিকে ব্যর্থ হলেও পরে গাজীপুর থেকে উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ করে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করেন। সেই চারা দিয়েই আসে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
বর্তমানে সুমনের এক একর ৪৮ শতক জমি এবং তিনটি মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ শ পূর্ণবয়স্ক পেঁপে গাছ। এখানে শাহী ও কাশ্মীরি জাতের পেঁপে চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার থেকে ৫ মণ পর্যন্ত ফল পাচ্ছেন এই চাষী। তার বাগানে সর্বোচ্চ ৫ কেজি ওজনের পেঁপেও উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে তার বাগানের কাঁচা ও পাকা পেঁপে প্রায় ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করছেন। পেঁপের পাশাপাশি তিনি মাছের ঘেরের পাড়ে সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, করলা, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে থাকেন। এ ছাড়াও পুকুরের চারপাশে মাচা পদ্ধতিতে বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করে বছরে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আয় করেন এই উদ্যেক্তা।
এর বাইরেও তিনি ৪৮ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ‘দেলোয়ারা এগ্রো ট্রেনিং সেন্টার’। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণ উদ্যোক্তা, বেকার যুবক, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। গত তিন বছরে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ২ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন, যাদের অনেকেই এখন সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন বলে জানিয়েছেন সুমন
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে সুমন কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার পেঁপের চারা বিক্রি করেছেন। এতে তার প্রায় ৬০ লাখ টাকা লাভ হয়েছে তার। এমন সফলতা দেখে বাবুগঞ্জসহ বরিশালের বিভিন্ন এলাকার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
২০২৩ সালে পেঁপে চারা বিক্রি শুরু করেন সুমন। প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ভাল মানের পেঁপে চারা তৈরি করে বিক্রি করেন তিনি। খরচ বাদে প্রতিটি চারায় ৫টাকা করে লাভ করেন এই উদ্যেক্তা। আগামী ২০২৭ সালে সারা দেশে ২০ লাখ চারা বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে একটি আধুনিক পলি হাউস নির্মাণ করেছেন।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে তিনি সাতটি সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। অল্প জমিতে অধিক ফলন উৎপাদনের জন্য নেপাল থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। এ ছাড়া ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসা সম্মাননাও পেয়েছেন। নেপালের পার্লামেন্ট থেকে ও ভারত থেকে নিজ হাতে এসব সম্মাননা ও পুরস্কার গ্রহণ করেন আবু বকর সিদ্দিকী সুমন। একই অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পুরস্কৃত হয়েছেন।
শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেও কাজ করছেন সুমন। তিনি এলাকার মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে পেঁপের চারা বিতরণ করেন। দরিদ্র পরিবার ও প্রতিবেশীদের উন্নত জাতের চারা দিয়ে চাষে উৎসাহিত করেন। নিজের উৎপাদিত পেঁপে স্থানীয় এতিমখানায়ও বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকেন তিনি।
সুমন বলেন, আমি চাই বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। একজন শিক্ষার্থী যদি মাত্র ২৫টি উন্নত জাতের পেঁপে গাছ লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করে, তাহলে একটি মৌসুমেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। সরকারি আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হলে আরও অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, 'আমরা তাঁর বাগান একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। তিনি একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নত জাতের মানসম্মত পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সহায়তা করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়।'
কৃ/স/জয়