কৃষি সময়
প্রকাশ : Nov 7, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যর আশা

যশোর সংবাদদাতাঃ 
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারা ইউনিয়নের ৭৫ গ্রামের (গদখালী ও পানিসারার) মাঠজুড়ে চাষাবাদ হয়েছে নানা জাতের ফুলের। শীতের আগমনী বার্তায় এসব এলাকার মাঠ হরেক রকমের ফুলে সাজতে শুরু করেছে। এখানকার চাষীদের উৎপাদিত ফুল সরবরাহ করা হয় সারা দেশে। এবার এ অঞ্চল থেকে শতকোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছেন চাষী ও কৃষি বিভাগ। 

ঝিকরগাছার পদখালীর ও পানিসারা ইউনিয়নের ৭৫ গ্রামে মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুল চাষাবাদ হচ্ছে। এখানকার যেদিকেই তাকানো যায়,সবদিকেই ফুল আর ফুল। গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন রকম দামি ফুল চাষাবাদ করছেন এখানকার চাষীরা। ফুল চাষাবাদই এখানকার চাষীদের প্রধান কাজ। এর মাধ্যমেই চলে তাদের জীবন জিবিকা। 

১৯৮৩ সালে যশোরের গদখালীতে মাত্র ৩০ শতক জমিতে রজনীগন্ধা ফুল চাষের মাধ্যমে দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ ও বিপণন শুরু করেন প্রয়াত কৃষক শের আলী সরদার। এখন সেখানে মাঠের পর মাঠজুড়ে দেখা যায় নানা রঙের ফুল চাষাবাদ।

শহর থেকে পশ্চিমের উপজেলা ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। এলাকার প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কৃষক এখন ফুলচাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বছরজুড়ে চাষীরা এখানকার জমিতে নানা রকমের ফুল চাষাবাদ করেন। এই ফুল তারা স্থানীয় বাজার সহ মোকামে বিক্রি করেন। তবে বিভিন্ন দিবসে বাড়তি ফুল বিক্রির লক্ষ নিয়ে তারা চাষাবাদ করেন। 

বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস, ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস, ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন, ১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ, ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবস, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা ও বসন্ত দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও নানা অনুষ্ঠান ঘিরে এলাকার ফুলচাষিরা স্বপ্নপূরণের আশা দেখেন। 

ফুলের মূল উৎপাদন এলাকা গদখালীতে রয়েছে ফুলের বড় মোকাম। এখানে প্রতি বছর প্রায় শতকোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা আসেন এই মোকামে ফুল কিনতে। ফলে চাষীরা সহজেই এই মোকামে ফুল বিক্রি করতে পারেন। এ জন্য তাদের দুরে যেতে হয় না। 

গদখালী ও পানিসারার চাষিরা জানান, তারা আড়তে প্রতি পিস গোলাপ ৫ থেকে ৮ টাকা, গ্লাডিওলাস ১০ থেকে ১৫ টাকা, জারবেরা ৮ থেকে ১০ টাকা, রজনীগন্ধা ৬ থেকে ৮ টাকা, ১শ পিস চন্দ্রমল্লিকা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, এক হাজার গাঁদা ফুল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে সাধারণত বিক্রি হয়। চাহিদা অনুসারে ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে দাম ওঠা-নামা করে। 

ঝিকরগাছার সৈয়দপাড়া গ্রামের রমজান আলী জানান, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার ফুল উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক খরচ, চারার দ্বিগুণ মূল্য, সার-কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচ বেড়েছে।

আব্দুর রহমান নামে আরেক ফুল চাষী জানান, প্রতি একর জারবেরা ফুল চাষ করতে ৩৮ লাখ টাকা খরচ হয়। রজনীগন্ধা চাষে একরপ্রতি খরচ প্রায় ৩ লাখ টাকা, গোলাপ ৫ লাখ টাকা, গ্লাডিওয়াস সাড়ে ৪ লাখ টাকা, গাঁদা চাষে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ফুলহাটে ইজারাদারের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে কখনো কখনো ফুলের বাজার অস্থিতিশীল হয়। এ সমস্যা সমাধানে তিনি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

স্থানীয় ফুল ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, ইংরেজি নববর্ষ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বেশি চাহিদা থাকে গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, জিপসি ও চন্দ্রমল্লিকার। বিজয় দিবসে যে গোলাপ ৪ টাকা বিক্রি হয়, এই সময় তা ৮-১০ টাকা পাইকারি বিক্রি হয়। আর ৪ টাকার রজনীগন্ধা বিক্রি হয় ৭-৮ টাকা। চলতি মৌসুমে চাষিরা ফুলের দাম ভালো পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চাষিরা। বাজার এভাবে চাঙ্গা থাকলে চাষিরা শতকোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারেন।

চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখানকার আবহাওয়া ফুল চাষের উপযোগী। তবে সমস্যা হচ্ছে, এখানে উৎপাদিত ফুলের স্থায়িত্বকাল অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এ জন্য বেশি সময় ফুল তরতাজা থাকে না। সরকার কিছু সুবিধা দিলে ফুল-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। বিশেষ করে বিশেষ সুবিধায় কৃষিঋণ দেওয়ার কথা বলেন তারা, যা মসলা চাষে দেওয়া হয়। চাষের প্রযুক্তিতে ভর্তুকি দেওয়া দরকার বলেও দাবি তাদের।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুম হোসেন পলাশ জানান, ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। বিশেষ করে গদখালী, পানিসারা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটিকুমড়া, বাইসা, কাউবা, ফুলিয়া আর শার্শার নাভারণ, উলাশি, গদখালী ও শ্যামলাগাছি গ্রাম প্রায় বছরজুড়ে ফুলে ফুলে শোভিত থাকে। যশোরে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১৫ ধরনের ফুলের চাষ হয়। এখানে নতুন নতুন জাতের ফুলের চাষ করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া গত কয়েক বছর টিউলিপ ও লিলিয়াম ফুল চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন এখানকার চাষিরা। এ বছরও চাষ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ফুলের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফুলের চাহিদা বাড়ছে। আধুনিক সমাজে ফুলের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে শুধু শৌখিনতায় নয়, ফুল এখন বিরাট অর্থকরী ফসল। সময়ের চাহিদার আলোকে দেশের অর্থনীতিতেও ফুলের অবদান ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফুলের বাণিজ্যিক প্রসার খুব বেশি দিনের নয়। নব্বইয়ের দশকের আগে দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। মাত্র দুই দশকের পথচলায় ফুল-বাণিজ্য অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ফুল। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদ্মার ২ বাঘাড় বিক্রি হলো সোয়া লাখ টাকা

1

হাঁস খামারিদের পথ দেখাচ্ছেন ইয়াসিন

2

পাটের গৌরব ফিরিয়ে আনতে গবেষণা চলছে-পট প্রতিমন্ত্রী

3

আমন চাষের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

4

তিন বছরে অগ্রগতি ২২ শতাংশ, এবার কি গতি ফিরবে পার্টনারে?

5

সিরাজগঞ্জে আখের বাম্পার ফলনের আশা

6

চাহিদা অনুযায়ী সারের কোনো ঘাটতি নেই: কৃষিমন্ত্রী

7

হাওরের ধান যথাসময়ে কাটতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে : কৃষ

8

লতি কচু চাষে কৃষকের ভাগ্যবদল

9

বৃক্ষরোপণকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে-পরিবেশ প্রতিমন্ত্র

10

গারো পাহাড়ে লটকন চাষে নতুন সম্ভাবনা

11

নকল কীটনাশক তৈরিতে জেল-জরিমানা

12

ইটভাটায় ৩০ লাখ টাকা জরিমানা

13

আলো ছড়াচ্ছে যমুনাপাড়ের সোলার পার্ক

14

বাধ্যতামূলক অবসরে সচিব মিয়ান কৃষিতে রেখে গেছেন নিজস্ব বলয়

15

হাটে হাটে নতুন পাটের দামে খুশি চাষিরা

16

কৃষি সচিবের রুটিন দায়িত্বে নাসির- উদ-দৌলা

17

জিংকসমৃদ্ধ বিনাধান–২০ চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন

18

পার্বত্য অঞ্চলে আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণে কৃষিমন্ত্রীর সহযোগিত

19

কৃষি খাতে স্থবিরতা

20