পঞ্চগড় সংবাদদাতাঃ
এক দুই টন নয়। প্রতিদিন একটি হাটে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ২শ’ট জলপাই। যার বাজার মূল্যে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা গড়ে উঠেছে এই জলপাইয়ের হাট। হাটে জলপাই কেনা-বেচাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার বিপুল পরিমাণ মানুষের। স্থানীয় চাষী এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন,এখানে একটি হিমাগার স্থাপন করা গেলে তারা আরো অনেক বেশি রাভবান হতে পারবেন।
জানা যায়,দেবীগঞ্জ উপজেলায় তিন হেক্টর জমিতে জলপাই চাষ হয়। স্থানীয় উৎপাদন কম হলেও পঞ্চগড়ের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে এই হাটে আসেন।
মৌসুমজুড়ে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন এই হাটে। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, নছিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে আনা হয় এসব জলপাই। কারও কাছে হাটটি নিজের গাছের ফল বিক্রির জায়গা, আবার কারও কাছে বছরের পর বছর ধরে জীবিকার উৎস।
হাটজুড়ে ছোট-বড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে জলপাই। কোথাও চলছে ওজন, কোথাও আকার অনুযায়ী বাছাই। পরে জলপাই পরিষ্কার করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এসব কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরাও অংশ নিচ্ছেন।
জলপাইয়ের এই হাটকে ঘিরে মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েকশ মানুষের। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন পাইকারের হয়ে জলপাই কেনা, বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিকও রয়েছেন।
এই হাটে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ছ ১৪০ থেকে ২শ’ট জলপাই কেনা বেচা হয়। যা পাইকারদের হাত ধরে চলে যাচ্ছে সারা দেশের বাজারে।
এই হাটে জরফাই বিক্রি করতে আসা দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্ব দেবীডুবা এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন,একটি গাছে এবার প্রথম জলপাই ধরেছে। ১৬ টাকা কেজি দরে ৫৩ কেজি জলপাই বিক্রি করেছি। যে দাম পেয়েছি, তাতে আমি খুশি।
চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, এই বাজার থেকে তিনি প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ টন জলপাই কেনেন। তার মতো চট্টগ্রামের আরও পাইকার রয়েছেন, যারা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ টন করে জলপাই কেনেন। এসব জলপাই বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাতেও পাঠানো হয়।
পঞ্চগড় থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মতিউর রহমান জানান, আট বছর ধরে তারা তিনজন মিলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে জলপাই কিনে এই হাটে এনে বিক্রি করেন। দিন শেষে জনপ্রতি এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে জলপাইয়ের ব্যবসা করছেন স্থানীয় পাইকার মো. বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টন জলপাই কেনাবেচা করেন। এর একটি অংশ প্রাণ কোম্পানিতে পাঠানো হয়। বাকিগুলো ঢাকা, বরিশাল, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যায়। এ ছাড়া দেবীগঞ্জের জলপাই দেশের বাইরেও রপ্তানি হয় বলে জানান তিনি।
হাটের ইজারাদার কাদেরী কিবরিয়া রানা বলেন, এই হাটে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ টন জলপাই কেনাবেচা হয়। সংরক্ষণাগার বা হিমাগার না থাকায় প্রতিদিনের জলপাই সেদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে হয়। সরকারিভাবে হিমাগার স্থাপন এবং আশপাশের অবৈধ স্থাপনা সরানো হলে হাটটির পরিসর বাড়বে এবং এটি আরও পরিচিতি পাবে বলে মনে করেন তিনি।
জলপাই চাষী এবং ব্যবসায়ীরা জানান,এত বড় বাজার হলেও জলপাই সংরক্ষণের জন্য এখানে নেই কোনো হিমাগার। ফলে কেনাবেচার পর দ্রুত জলপাই বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতে হয়। হাটের পরিসর বাড়ানো এবং সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তাদের।
দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাঈম মোর্শেদ বলেন, দেবীগঞ্জের দেবদারুতলা উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম জলপাইয়ের হাট। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে জলপাই কেনাবেচা চলে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারেরা এই হাটে জলপাই কিনতে আসেন। দেবীগঞ্জ তথা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কৃ/স/জয়