কৃষি সময় ডেস্কঃ কাঁচামাল সংকটে দেশের একমাত্র ডিএপি উৎপাদনকারী কারখানাটিও বন্ধ রয়েছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ডিএপি সারের সবচেয়ে বড় উৎস সৌদি আরব থেকে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে আরেক চুক্তিবদ্ধ উৎস চীনও সার রফতানি বন্ধ রেখেছে। ফলে ডিএপি আমদানির জন্য জিটুজি চুক্তিবদ্ধ তিনটি দেশের মধ্যে বর্তমানে শুধু একটি উৎস থেকে সার পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে চারটি করে লট ডিএপি আমদানি প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সার আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
ইতোমধ্যে সংকট আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএডিসি। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে আগামী শীতকালীন ও বোরো মৌসুমে দেশে ডিএপি সারের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
বিএডিসি জানায়, চলতি অর্থবছরে আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টন ডিএপির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বিএডিসির আমদানি লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ২১ হাজার টন। ২৩ জুলাই পর্যন্ত বিএডিসির কাছে ডিএপির মজুদ ছিল ৩ লাখ ৯০ হাজার টন। চুক্তির আওতায় নির্ধারিত শিপমেন্ট শিডিউল অনুযায়ী মরক্কো থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য আমদানি ৩ লাখ ২০ হাজার টন। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে মজুদ ও আমদানিসহ বিএডিসির কাছে সম্ভাব্য ডিএপি থাকবে ৭ লাখ ১০ হাজার টন। ফলে বিএডিসির বরাদ্দের বিপরীতে ফেব্রুয়ারিতে ডিএপির সম্ভাব্য মজুদ ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ১১ হাজার টন।
বিএডিসি ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিএডিসি। চিঠিতে ডিএপি ও টিএসপি সারের বর্তমান মজুদ, আগামী পিক সিজনে চাহিদা এবং কী পরিমাণ আমদানি প্রয়োজন তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বিএডিসি সূত্র জানিয়েছে, টিএসপি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা হয় না, সেজন্য এটির আমদানি নিয়ে সমস্যা হবে না। তবে ডিএপি নিয়ে সংকট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
সংস্থাটির চিঠিতে আরো জানানো হয়, বিএডিসি জিটুজি চুক্তির আওতায় মরক্কো, সৌদি আরব ও চীন থেকে ডিএপি আমদানি করে। যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব থেকে আমদানি অনিশ্চিত। ফলে মরক্কোর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ঐচ্ছিক লটের ডিএপি সার আমদানি করা জরুরি।
চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডিএপির সাতটি লট আমদানি করার কথা থাকলেও আমদানি করা সম্ভব হয়েছে মাত্র একটি লট। আরেকটি লট আমদানির সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হলেও লোহিত সাগরে উত্তেজনায় সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সৌদি আরবের কোম্পানি মা’আদেন আগস্টে কোনো সার সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সেপ্টেম্বরে সরবরাহের কথা বললেও হরমুজ প্রণালি কিংবা লোহিত সাগর পরিস্থিতির কারণে পিক মৌসুমে সার আমদানির বিষয়টি অনিশ্চিত।
বিএডিসি জানিয়েছে, আগামী অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সারের পিক সিজনে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে চুক্তিতে থাকা নিশ্চিত লটের (দুই লট) পাশাপাশি আগস্ট-অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে ঐচ্ছিক দুটি করে লট ডিএপি আমদানি অত্যাবশ্যক। অন্যথায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সার আমদানি সম্ভব হবে না এবং সময়মতো বিতরণও করা যাবে না। এতে দেশে সার সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় বিএডিসির কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। তবে জানা গেছে,দেশে যে পরিমাণ ডিএপি মজুদ আছে তা দিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সারের সর্বাধিক চাহিদা থাকে। গত বছর অক্টোবরে ডিএপির চাহিদা ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার টন, নভেম্বরে ১ লাখ ২৫ হাজার, ডিসেম্বরে ২ লাখ ৬৭ হাজার এবং জানুয়ারিতে চাহিদা ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার টন। এজন্য শীতকালীন সবজি ও বোরো মৌসুমের মাসে ডিএপির চারটি লট (এক লটে ৪০ হাজার টন) আমদানি প্রয়োজন। এ পরিমাণ আমদানি করা না গেলে সংকটের ঝুঁকি রয়েছে।’
এ বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, যে পরিমাণ ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে তাতে দেশে আপাতত কোনো সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সোমবার পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে সারের মজুদ ছিল ১৫ লাখ ৮৮ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ছয় লাখ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৭ হাজার, ডিএপি ৪ লাখ ১৪ হাজার এবং এমওপি ২ লাখ ১৮ হাজার টন। ডিএপি ও ইউরিয়ার ন্যূনতম নিরাপদ মজুদ ধরা হয় পাঁচ লাখ টনকে। সে হিসাবে ডিএপির ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমার চেয়ে ৮৬ হাজার টন কম মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে আগস্টে চাহিদা রয়েছে ৮৮ হাজার ৭০০ টন। অর্থাৎ আগস্টের বরাদ্দ ডিলার পর্যায়ে পৌঁছলে ডিএপির মজুদ সোয়া তিন লাখে নেমে আসবে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম বলেন, ‘বিএডিসি ডিএপি আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। এ মুহূর্তে যে মজুদ সেটা দিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এরপর ফসলের পিক সিজন শুরু হবে। বিএডিসির সঙ্গে আমরাও একমত। নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি চার মাস অন্য সময়ের মতো না। ওই সময়ে চাহিদা অনেক বেশি। জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বরÑএ তিন মাসে যে পরিমাণ চাহিদা তখন এক মাসেই তার চেয়ে বেশি চাহিদা থাকে। ফলে সেই সময় এখনকার মতো আমদানি করলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে না। কারণ আমাদের মজুদ কম।’
দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। মঙ্গলবার গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) এক কর্মশালায় মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এছাড়া পাইপলাইনে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও প্রাপ্যতা রয়েছে। তবে একটি মহল সার সংকটের রিউমার ছড়াচ্ছে। সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে; যা সরকার কঠোরভাবে নজরদারি করছে।’