সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ৩৮ বছর ধরে রিং বাঁধ দিয়ে কৃষকদের ফসল রক্ষার চেষ্টা। তবু শেষ রক্ষা হয় না। এ বাঁধ শীত কালে দেয়া হয়। আর বর্ষাকালে কেটে দেয়। এতে কৃষক আর খামারীরা যেমন চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তেমনি প্রতি বছর এ বাঁধ দেবার নামে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। অথচ ১ হাজার ২৫০ মিটার একটি ডুবোবাঁধ দিলেই এ সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই পরিকল্প আর আর আলোর মুখ দেখছে না। রিং বাঁধের কারনে এমন দুর্ভোগ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রাউতারা এলাকায়।
জানা যায়, সিরাজগঞ্জ সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (এসআইআরডিপি) আওতায় সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বাঘাবাড়ী থেকে উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের প্রায় ৬২ হাজার ৭৫৬ হেক্টর জমির বোরো ধান আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করা এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এ বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৭ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৯০ সালে। এই বাঁধের পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মাণ করা হয় রাউতারা স্লুইসগেট। তবে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় নির্মিত বাঁধের শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী অংশের রাউতারা স্লুইসগেটের পশ্চিম পাশে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার এলাকা ভেঙে যায়। একই সঙ্গে স্লুইসগেটটিও প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর পর থেকে প্রতি বছর ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে এ ভাঙন স্থানে বাঁশ, খুঁটি পাইলিং করে, বালির বস্তা দিয়ে অস্থায়ী রিং বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এর কাজ শুরু হয়ে এপ্রিলে শেষ হয়। তবে মে মাসে ধান কাটা শেষ হলে জুনের শেষে মাছ ধরা ও নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে এ বাঁধ কেটে দেন অসাধু মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। চলতি বছর এ অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রতি বছর এভাবে মোটা অংকের টাকা খরচে এই বাঁধ মেরামত করা হয়।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনা করে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সাবমার্সিবল বাঁধ নির্মাণের সমীক্ষা পরিচালনা করে। প্রায় ৫৫ কোটি টাকা খরচে এ ডুবোবাঁধের দুটি স্থানে ১৫ মিটারের খোলা রাখা অংশ থাকবে। পানি বাড়লে খোলা স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে এবং বন্যায় বাঁধটি ডুবে যাবে। আবার পানি কমে গেলে খোলা অংশ দিয়ে নৌকা ও মৎস্যজীবীরা স্বাভাবিক চলাচল করতে পারবেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি।
ফলে প্রতি বছর এ অস্থায়ী ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়। আগাম বন্যায় এ অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৫০ হেক্টর কৃষি ও গোচারণভূমি তলিয়ে যায়। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েন খামারিরা।
বাঘাবাড়ী এলাকার কৃষক রহমত আলী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনছি এখানে একটি ডুবোবাঁধ নির্মাণ করা হবে। কিন্তু তা বাস্তাবায়ন না হওয়ায় এখনো আমাদের আগাম বন্যার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জ পাউবো-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহীনুর আলম জানান,স্থানীয়দের টেকসই সমাধানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৫০ মিটার দৈর্ঘের একটি ডুবোবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি সমীক্ষা শেষ করে আইডব্লিউএম। চলতি বছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সমীক্ষার কাগজপত্র ও ডিজাইন পাঠানো হয়েছে। সেটি পাস হয়ে এলে ডিপিপি পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, এখানে একদম শক্ত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ জটিল বিষয়। সাবমার্সিবল বাঁধ নির্মাণের জন্য সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষের দিকে। এটি শেষ হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে। সরকার ও পরিবেশ বিভাগের অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করে এবং বাজেট পাস হলে এর নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।
কৃ/স/জয়