কৃষি সময় ডেস্কঃ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকেরা দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি আড়িয়াল বিলের দেশীয় ছোট মাছে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন । মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশি সহ শুধু মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় মিলেছে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা।
গবেষণায় দেখা যায়, কই মাছেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্ত্রে গড়ে ১.৭০-১.৯০ এবং ফুলকায় ১.৩০- ১.৪০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে। কইয়ের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এরপর রয়েছে মেনি ও গুলশা টেংরা। সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে।
তৃণভোজী বাটা মাছের মাংসপেশিতে তিন ঋতুতেই প্রায় ০. ৮০- ০.৯০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। নান্দিনা বা মেনি মাছের মাংসপেশিতে ০.৬০- ০.৭০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে গুলশা টেংরাতেও।
গবেষণায় আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর এই পাঁচটি স্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কই, বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটিসহ পাঁচ প্রজাতির মোট ১৫০টি দেশীয় মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সড’ এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
বাংলাদেশে এর আগেও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল, হাওরাঞ্চল, সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকা এবং বঙ্গোপসাগরের মাছ ও চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। একই গবেষক দল চলনবিল ও হাওরের মাছ নিয়েও গবেষণা করেছে। সেখানে তলদেশে বসবাসকারী মাছের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল।
গবেষণার প্রধান গবেষক এবং বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আড়িয়াল বিলের মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে।
কৃ/স/জয়