কৃষি সময় ডেস্কঃ
ছাদ বাগান করে ব্যঅপক সফলতা পেয়েছেন শারমিন আক্তার নামে এই নারী উদ্যোক্তা। তিনি নিজের ছাদ বাগান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা ও টব বিক্রি করে বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি। শুধু আর্থিক সাফল্যই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এর ‘ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদ বাগান’ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। সফল এই নারী উদ্যোক্তা রাজশাহীর বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা।
জানা যায়,তিনি ২০২২ সালে নিজের বাড়ির ছাদে সীমিত পরিসরে কয়েকটি গাছ লাগানোর মাধ্যমে শুরু হয় তার যাত্রা। তখন এটি ছিল নিছক শখ। কিন্তু প্রতিটি গাছের প্রতি ভালোবাসা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং নতুন নতুন প্রজাতি সংগ্রহের আগ্রহ তাকে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। ‘আজ সেই ছোট উদ্যোগ প্রায় ২ হাজার ৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত একটি আধুনিক ছাদ বাগানে পরিণত হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় ১১০ প্রজাতির সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গাছ।
শারমিন আক্তারের ছাদ বাগান শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি এক অর্থে একটি জীবন্ত উদ্ভিদ সংগ্রহশালা। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট- অ্যাডেনিয়াম, অ্যাগলোনিমা, এনথুরিয়াম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, জেডজেড প্ল্যান্ট, সাকুলেন্ট, ক্যাকটাস, মানি প্ল্যান্ট, ইউফোরবিয়া, ফার্নসহ অসংখ্য বিদেশি ও দেশি প্রজাতির গাছ। ঔষধি গাছের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। লেমন গ্রাস, স্টেভিয়া, কালমেঘ, ইনসুলিন গাছ, নিম, রোজমেরি, অরেগানো, পাথরকুচি, উলটকম্বলসহ নানা গাছ নিয়মিত সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা হয়। এছাড়া পারিজাত, সাদা জাম, মিষ্টি তেঁতুল, ফিডল লিফ ফিগ, সাইকাসের মতো বিরল গাছও রয়েছে তার সংগ্রহে।
শুধু বিদেশি গাছ নয়, দেশীয় বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ উদ্যোক্তা শারমিন। কর্পূর, অশোক, হিজল, পলাশ, মহুয়া ও বটের মতো গাছ সংরক্ষণ করে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। ফলদ গাছের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, স্ট্রবেরি, রামবুটান, অ্যাভোকাডো, আপেলসহ নানা প্রজাতি। পাশাপাশি মরিচ, টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, করলা, শসা, সজনেসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও উৎপাদন করেন তিনি।
রাজশাহীর বিনোদপুর এলাকায় তিনতলা বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে বাইরে থেকে সাধারণ একটি বাড়ি বলেই মনে হয়। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতেই চোখের সামনে খুলে যায় এক অন্য জগৎ। চারদিকে রঙিন ফুল, ফলের গাছ, ঔষধি উদ্ভিদ, বিরল প্রজাতির সংগ্রহ এবং নান্দনিকভাবে সাজানো টবের সারি। মনে হবে যেন শহরের কংক্রিটের ভিড়ে লুকিয়ে আছে একটি ছোট্ট উদ্যান। যার প্রতিটি কোণেই রয়েছে যত্নের ছাপ। কোথাও ফুটে আছে রঙিন ফুল, কোথাও দুলছে ফলের কচি ডাল, আবার কোথাও সারিবদ্ধভাবে সাজানো ইনডোর প্ল্যান্ট। তিন স্তরের আধুনিক এই ছাদ বাগানের প্রতিটি অংশ পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। বাগানটির নাম রাখা হয়েছে ‘ন্যাচার’স টাচ’, যদিও স্থানীয়দের কাছে এটি এখন বেশি পরিচিত ‘কৃষিবাড়ি’ নামে।
শারমিনের উদ্যোগ শুধু সৌখিন বাগানেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন একটি সফল ব্যবসা। অনলাইন ও অফলাইন-দুই মাধ্যমেই বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা ও টব বিক্রি করেন তিনি। শারমিন জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি পরিচিত ক্রেতাদের মাধ্যমেও তার বাগানের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। অর্ডার পাওয়া মাত্র যত্নসহকারে চারা প্রস্তুত করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়।
এই ব্যবসা থেকেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা ও বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে তিনজন কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। ভবিষ্যতে রাজশাহীতে অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার জানান, ছোবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার টান ছিলো। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্টে পাড়াশোনা করলেও ছোটবেলার টান থেকে এই কাজে যুক্ত হওয়া। তিনি চান রাজশাহীতে একটি বৃহৎ নার্সারি গড়ে তুলতে, যেখানে বিরল ও দেশীয় গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করাই তার অন্যতম লক্ষ্য। তার বিশ্বাস, কৃষি শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, শহরের প্রতিটি ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গাও একদিন সবুজে ভরে উঠবে। শারমিন আক্তারের গল্প আসলে একজন নারীর স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। যে ছাদ একসময় ছিল অব্যবহৃত, সেটিই আজ হাজারো গাছের আশ্রয়স্থল, একটি সফল ব্যবসার কেন্দ্র এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উজ্জ্বল উদাহরণ।
‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫ প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান,এই সম্মান আমার বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছে। জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মূল্যায়ন হওয়ায় আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
কৃ/স/জয়