কৃষি সময়
প্রকাশ : Jul 14, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বন্যায় ক্ষত বিক্ষত কৃষি,মৎস্য,প্রাণী খাত



 কৃষি সময় ডেস্কঃ  এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে টানা বৃষ্টিপাতে দেশের মানুষ নাকাল হয়ে পড়েছে। বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা, সিলেটের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ছাড়াও আরো কিছু জেলা। এমন দুর্যোগে কম বেশি দেশের প্রায় প্রতিটা জেলাতেই কৃষি,মৎস্য ও প্রাণী সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বানের পানি কমতে শুরু করায় জেগে উঠেছে ক্ষয় ক্ষতির ভয়াবহতা। সেই ক্ষতি কিভাবে পুশিয়ে উঠবেন সেই দুশ্চিন্তায় কৃষক আর খামারীদের কপালে চিন্তার ভাজ। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবার তিন জেলায় তিনটি নদীর পানি চার পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে বইছিল। এদিকে বন্যার পানি কমতে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত সাত জেলায় বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তার মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামেই প্রাণ হারিয়েছে ৪৪ জন।

জানা যায়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌর এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন। নিহতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ জন মারা গেছে কক্সবাজার জেলায়।

কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় নিহত হয়েছে ১৩ জন। চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ১৬ হাজার ৮২১ জন আশ্রয় নিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বান্দরবানে ছয়জন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছে; এ জেলায় খোলা হয়েছে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র। রাঙামাটিতে নিহত হয়েছে তিনজন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়িঘের এবং প্রায় চার হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের জেলা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, বন্যায় ৬৫টি পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৪৪ হাজার মুরগি। শতাধিক গরু-ছাগল মারা গেছে। গবাদি পশুর শুকনা খাবার নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টন। কাঁচা ঘাসের জমি নষ্ট হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার একর। প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি টাকা।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর খাগড়াছড়িতে এক হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা, আউশ ধানের চারা, বিভিন্ন ধরনের সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দীঘিনালায় ক্ষতি হয়েছে বেশি। এ ছাড়া বন্যার পানিতে বহু পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, বন্যায় জেলাজুড়ে বসতবাড়ি ছাড়াও কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

এদিকে হবিগঞ্জ জেলায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। সরকারি তিনটি দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবেই ক্ষতির পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে মৎস্য খাতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এক হাজার মাছের খামার ও ব্যক্তিগত পুকুর প্লাবিত হয়ে বিপুল অঙ্কের টাকার মাছ ভেসে গেছে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে শুধু এ খাতেই ক্ষতি প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে উন্মুক্ত জলাশয় ও ব্যক্তিগত খামার মিলিয়ে প্রায় ৫৮ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হলেও চলতি অর্থবছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

মৎস্য খাতের পাশাপাশি বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রাণিসম্পদও। বন্যার পানিতে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন পশুখাদ্য (খড়) নষ্ট হয়েছে। ফলে খামারিরা এখন পশুখাদ্যের তীব্র সংকটে পড়েছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে এ খাতে প্রাথমিক ক্ষতি প্রায় ১২ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪২ হাজার ৩৫৫ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে এক হাজার ৬৪২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কৃষি খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে অন্তত ২০ কোটি টাকা। 

মৌলভীবাজার, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যায় জেলার প্রায় ৪০৫টি পুকুর ও জলাশয় প্লাবিত হয়েছে, যার ফলে এসব উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ের বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।

আবাহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন সারা দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি বায়ু দেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে। এ কারণে বিক্ষিপ্তভাবে সারা দেশে বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৃষ্টিপাত আরো অন্তত তিন দিন থাকতে পারে।

ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন-উর রশিদ জানিয়েছেন,সারা দেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করা হচ্ছে। সাবর্কি তথ্য হাতে এলেই সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। 
কৃ/স/জয়


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জলবায়ু-স্মার্ট কৃষিতে নেতৃত্বে বাংলাদেশ

1

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

2

ট্রাম্প ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন, প্রথম দিনেই সই করবেন রেকর্ডসংখ্য

3

চিংড়ি রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে

4

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনই বড় চ্যালেঞ্জ -কৃষিমন্ত্রী

5

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

6

ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে

7

উপদেষ্টার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর!

8

মেঘনা চরের কৃষকদের স্বপ্ন এখন পানির নিচে

9

উৎপাদনকেন্দ্রিক কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর ঘটাতে হব

10

সীড এসোসিয়েশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ

11

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

12

আইএসও সার্টিফিকেশন অর্জন করলো সিনট্যাক্স গ্লোবাল

13

সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা চলনবিল

14

৪৮ রানে ৭ উইকেট হারাল পাকিস্তান, ওয়ারিকানের স্পিন–ঘূর্ণি

15

পেঁয়াজের দাম এখনো চড়া, আমদানি অনুমতি চারগুণ বাড়লো

16

ফ্ল্যাট বিক্রি করে এমপির স্ত্রীর সাথে প্রতারণা, কারাগারে ধান

17

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় মূল চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষিম

18

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

19

মিরপুর চিড়িয়াখানা খাঁচা থেকে বের হওয়া সিংহ খাঁচায় ফিরল

20