কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 29, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কাজীপুরে চুন শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে

টি এম কামাল,কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকেঃ 
বাংলাদেশে পান চিবানো খুবই জনপ্রিয় ও পরিচিত। সাধারণত অতিথি আপ্যায়নে বা কোনো বৈঠক আলোচনার শুরুতে পানের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। আর পান বলতে শুধু পান পাতাই বোঝায় না। সঙ্গে থাকে ঠোঁট লাল করার চুন-সুপারি। ভারতবর্ষ ও বাংলার রসনা বিলাসী মানুষের কাছে পান জনপ্রিয়। পানে স্বাদ জোগাতে চুন আর সুপারি অপরিহার্য। সুপারি গাছে ধরে আমরা সবাই জানি কিন্তু চুন প্রস্তুত করতে হয়। এদেশে চুন বলতে শামুক ও ঝিনুকের তৈরি চুন বোঝাতো। কিন্তু কালের বিবর্তনণে এই জৈব উপায়ে তৈরি চুন এখন বিলুপ্তির পথে। এখন বাজারে দুই ধরনের চুন পেলেও পাথুরে চুনই বেশি।

সরেজমিন দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মাইজবাড়ী ইউনিয়নের কুনকুনিয়া গ্ৰামের চুনিয়াপাড়ায় চুন তৈরি ও বিক্রির পেশায় জড়িত অনেক পরিবার। যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনোরকম জীবন চলছে তাদের। চুনের একমাত্র তৈরি ও বিক্রির পেশায় সংখ্যাধিক্যের কারণে এলাকার নাম চুনিয়াপাড়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

চুন তৈরি নিয়ে কুনকুনিয়া গ্ৰামের চুনিয়াপাড়ার  আশাবালী বলেন, আমরা যারা চুন তৈরি করি আঞ্চলিক ভাষায় একে চুন্নিটা বলা হয়। এই চুন তৈরি করতে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করি প্রথমেই। আর তা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে গ্ৰামের আশপাশের নদী ও খাল বিল থেকে। আবার কখনও স্থানীয় হাট বাজার থেকেও। তারপর শামুক-ঝিনুকগুলো মাটির তৈরি খড়ির চুলায় পড়িয়ে বড় একটি পাত্রে উঠেয়ে তা ৩/৪ ঘন্টা ফুটানো হয়। ফোটানোর পর ৫০ কেজি চূর্ণ বিচূর্ণ শামুক-ঝিনুক থেকে প্রায় ১৬০ কেজি খাওয়ার চুন পাওয়া যায়। আর এই চুনে রাসায়নিক কোনো ধরনের কেমিক্যাল মেশানো হয় না। এক মণ চুন তৈরি করতে খরচ লাগে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আর ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।

একসময় নদী-নালা খাল-বিল ও জলাশয় ছিল অনেক বেশি। তখন জলাশয়ে ব্যাপক হারে শামুক- ঝিনুক পাওয়া যেত। তখন চুনের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের মাত্রা ছিল বেশ। স্বল্প মজুরি ও সহজলভ্য কাঁচামালে চুন উৎপাদন করে ভালোই চলছিল কারিগরদের সংসার। তবে কালের বিবর্তনে কাজীপুরে হারিয়ে যাচ্ছে শামুক-ঝিনুকের চুন উৎপাদনের কুটিরশিল্প। উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, জলাশয় কমে যাওয়ায় ঝিনুকের সংকট, জ্বালানি ও মজুরির মূল্যবৃদ্ধির ফলে অনেকে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। যে কয়েকটি পরিবার এখনো সংগ্রাম করছে, তাদের অবস্থাও করুণ। 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুনকনিয়া গ্ৰামে একসময় প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে অনেকে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। চুন তৈরির কারিগর আয়নাল হক ও তার স্ত্রী জাহানারা খাতুন বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা এই কাজ করে গেছেন। আমরাও অনেক কষ্ট করে এটি ধরে রেখেছি। ঝিনুক সংগ্রহ করতে আগের চেয়ে বেশি কষ্ট হলেও এই চুনই আমাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন।

স্থানীয় কারিগর মোকছেদ আলী বলেন, ‘বর্তমানে খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো সহজে ঝিনুক পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে উপকরণ ও জ্বালানির দামও বেড়েছে। ফলে চুন তৈরির খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’ সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এতে কারিগরদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হতে পারে। এজারনবী বলেন, আমরা আমাদের বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে পারতাম। দুলাল হোসেন বলেন, আমাদের উৎপাদিত চুন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয় এবং এর ভালো চাহিদা রয়েছে। তবে আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীর এবং শ্রমসাপেক্ষ হয়ে পড়েছে।

মাইজবাড়ী ইউপি'র সদস্য ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বংশপরম্পরায় চুনিয়াপাড়ার চুনের কারিগরেরা ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। চুনের কারিগরেরা যাতে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ পান, সে বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীন বলেন, ছোট ছোট এ ধরনের শিল্পের প্রসারে প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে। তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুনকনিয়া গ্রামের চুন উৎপাদন প্রক্রিয়া শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। এটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সমাজের সচেতন মহলের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। 

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আনারসের পাশে চাষ হচ্ছে কাজুবাদাম

1

উল্লাপাড়ায় রফিকুল ইসলাম খান নৌকা বাইচের ফাইনাল অনুষ্ঠিত, হাজ

2

সার পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় কৃষক দল নেতা!

3

শ্রীমঙ্গলে ময়লার ভাগাড় পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রী

4

কাজিপুরে জাম্বুরার ভালো দাম পেয়ে খুশি গাছিরা

5

৩ হাজার মিটার জাল জব্দ

6

কাজিপুরে কাঁঠালের বাম্পার ফলন

7

আধুনিক কসাইখানা হলে মাংস রপ্তানি বাড়বে

8

বৃক্ষরোপণকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে-পরিবেশ প্রতিমন্ত্র

9

মৎস্য প্রাণীসম্পদ খাতে ৪৪৩ কোটি ক্ষতি

10

হাঁসের খামারে রহিমার ভাগ্য বদল

11

শেরপুরে কালোবাজারে সার বিক্রির অপরাধে ২০ জনের নামে মামলা

12

বগুড়ার সবজির চারা যাচ্ছে সারা দেশে

13

গলদা -বাগদা চিংড়ি সংরক্ষণ করে পরিকল্পিত উৎপাদন বাড়াতে হবে

14

মুক্তমত প্রকাশ–সংক্রান্ত ও গায়েবি মামলা ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্

15

সিরাজগঞ্জে হাত ছিপ বর্শি দিয়ে বন্যার পানিতে মাছ শিকার

16

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনের আন

17

দিনাজপুরে আগাম শিম চাষে সফলতা

18

মেঘনার স্রোতে ধসে যাচ্ছে ইলিশা ঘাট

19

রংপুরে হিমাগারের ভাড়া কমানোর দাবিতে বিক্ষোভে কৃষক

20