পাবনা সংবাদদাতাঃ
পেঁয়াজ চাষাবাদে টানা লোকশান গুনেও বসে নেই চাষীরা। পাবনায় শুরু হয়েছে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষাবাদ। চাষীরা বলছেন গত বছরের চেয়ে এবার বিঘা প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি খরচে পেঁয়াজ চাষাবাদ করছেন তারা। তারা আশঙ্কা করছেন এবার বাড়তি খরচ করে ন্যায্য দাম এবং খরচ তোলা নিয়ে।
জানা যায়,এবার পাবনায় ৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ১৭১৬, আটঘরিয়ায় ৩৬০, ঈশ্বরদী ৮১১, চাটমোহর ৪৪০, ভাঙ্গুড়া ৪০, ফরিদপুর ৩৫৫, বেড়া ২ হাজার, সাঁথিয়া ১৬১৩ ও সুজানগর উপজেলায় ১৫৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এসব উপজেলা থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
সদর উপজেলার চরতারাপুরের কোলচুরি এলাকার কৃষক ইয়াসিন আলী বলেন, এ বছর ১০ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ লাগানো শেষ করেছি সপ্তাহ দুই তিনেক আগে। এখন চারা গজানোর সময়। কতটা গজিয়েছেও। গতবছর কিছু সার সরকারি রেটে পেলেও এবার ডিলারের থেকে আমরা সার পাই নাই। বিভিন্ন জায়গা থেকে সার ম্যানেজ করতে হইছে। প্রতি বস্তা ডিএপি সার কিনেছিলাম ২২০০ টাকায়। ৬০০ টাকার লেবার হয়েছে ৭০০ টাকা। এখন দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের মধ্যে মিললেও আমাদের আবাদের সময় বীজের দাম ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা লেগেছে। আবার আকারে বড় হওয়ায় এবার বীজ লাগছেও বেশি, বিঘাতে আমার কমপক্ষে ১৫ মণ লেগেছে। এভাবে বিঘায় ৫-১০ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। লিজের টাকাসহ বিঘায় এবার ৭০-৮০ হাজার খরচ যাবে। কিন্তু পেঁয়াজ বেচার সময় দাম নাই।
সুজানগর উপজেলার কামারদুলিয়া গ্রামের কৃষক আসলাম উদ্দিন বলেন, পাবনা অঞ্চলে লাল তীর বা এ জাতীয় হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়। এ বীজের দাম বর্তমানে আড়াই হাজার টাকা। বিঘায় ১৮-২০ বীজও মণ লেগে যাচ্ছে। গত বছর আকার ছোট হওয়ায় এতো লাগেনি। এতে দামে কম হলেও খরচ কমছে না। আবার সার কীটনাশকে ভোগান্তির শেষ নেই। বর্তমানে কড়াকড়ির জন্য সরকারি দামে ডিলারদের ওখান থেকে কিছু সার মিলছে। কিন্তু ৫-১০ বস্তা লাগলে সারাদিন লাইনে থেকে সর্বোচ্চ মেলে এক বস্তা। এভাবে আবাদ করাতো কঠিন। এসব কারণে বাধ্য হয়ে বাইরের খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে সার নিতে হচ্ছে। শুরুতেই সবাই বলে সার নাই। বেশি টাকা দিলে ঠিকই দেয়। এগুলোর অভিযোগ দিলে সার পাওয়া যায় না। আবার সব কীটনাশকের দাম বেড়েছে। সবমিলিয়ে ৭০-৯০ হাজার টাকা খরচ হবে এবার। গত বছর এই খরচ ছিল ৬০-৮০ হাজার টাকা।
কামারদুলিয়া গ্রামের আরেক কৃষক বাকু খাঁ জানান, গত বছরের আগের বছর বিঘায় কারো লাখ টাকাও লোকসান হইছে। গত বছর লাভ না হলেও অন্তত লোকসান থেকে বাঁচা গেছে। কিন্তু এবার কী হবে কে জানে।এই কৃষক বলেন, সবকিছুতে এবার খরচ বেশি। তেলের দাম বাড়ায় এবার সিঙ্গেল চাষে পাওয়ার ট্রিলারগুলোকে দিতে হচ্ছে ৯০০ টাকা, ১২০০ টাকার সেচে দিতে হবে ১৫০০-১৮০০ টাকা। এবার পেঁয়াজের দর মণ প্রতি ন্যূনতম আড়াই হাজার টাকা হওয়া লাগবে। না হলে আমাদের আবার বিপদ হবে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) লুৎফর রহমান জানান, আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয় চারা বা হালি পেঁয়াজ আসার আগে বাজারের চাহিদা মেটাতে। এবার এখনো কৃষকের ঘরে পেঁয়াজ রয়েছে। আবার গত কয়েক দফায় ভালো বাজার না পাওয়ায় অনেক কৃষক এবার মুড়িকাটার আবাদ কমিয়েছে। তবে আমরা ইতিবাচকভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করছি।খরচ বৃদ্ধি ও আবাদের সংকটের ব্যাপারে এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এক বিঘায় ৩০-৪০ কেজি সার ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কৃষক দেড় থেকে দুই বস্তাও ব্যবহার করেন। ফলে খরচ ও সারের প্রয়োজন অতিরিক্ত দেখা দেয়। বাইরে থেকে বেশি দামে সেই প্রয়োজন মেটান অনেকে। আবার এই অতিরিক্ত সার কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ভালো মানের পেঁয়াজ হচ্ছে না। ফলে সেগুলো ঘরে রাখা যাচ্ছে না, একসঙ্গে বাজারে তোলার কারণে দামও কম পাচ্ছে। এক্ষেত্রে সার কীটনাশক ব্যবহারে সুষম আবাদ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খরচের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
কৃ/স/জয়