স্টাফ রিপোর্টারঃ মিল্ক ভিটার ৬৪৮ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এখন কোন কাজেই আসছে না। দুগ্ধ কারখানা সম্প্রসারণের নামে বিগত পতিত সরকারের সময় বিদেশ থেকে এসব যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। কিন্তু এগুলো আনার পর কোনদিনও ব্যবহার না করায় এখন ভাঙারির দরে বিক্রির উপক্রম হয়েছে। এই যন্ত্রপাতি আমাদানির নামে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা লুটপাট করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
‘কৃষকের দুধ, কৃষকের প্রতিষ্ঠান’ স্লোগানে দেশের দুগ্ধ খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড বা মিল্কভিটা। এই সমবায়ী প্রতিষ্ঠানটি বিগত পতিত সরকারের সময়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এখন ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ৬৪৮ কোটি টাকার ৩টি প্রকল্প নেওয়া। ৮০ কোটি টাকা খরচের পর প্রকল্প বাতিল। আর শতকোটি টাকার আমদানি করা মেশিন বছরের পর বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে লোকসানের বোঝা বাড়ছে। বন্ধ হচ্ছে কারখানা, আর ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামারি। দেশের বৃহৎ এই দুগ্ধ প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সারা দেশের খামারীদের ক্ষোভ আর অভিযোগও কম নয়।
জানা যায়, ফরিদপুরে ডেইরী ফার্ম ও দুগ্ধ খামারা তেমন না থাকলেও প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল মিল্কভিটার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। শত শতকোটি টাকার মেশিনারিজ বিদেশ থেকে এনে স্থাপন করা হয়েছিল। এসব মেশিন আনার পর এক দিনের জন্যও চালু করা হয়নি। ব্যবহার না করায় বছরের পর বছর পড়ে থেকে তা জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে।
কাঁচামাল সংকট হবে উল্লেখ করে তখন সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ফরিদপুরে কারখানা স্থাপনে আপত্তি জানায়। মিল্ক ভিটার তৎকালীন চেয়ারম্যান নাদির হোসেন লিপু প্রধানমন্ত্রীর আত্নীয় প্রভাব বিস্তার করে এসব আমলে না নিয়ে সরকারের শত শতকোটি টাকা খরচ করে ওই কারখানা স্থাপন করেছিলেন। মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও কারখানা স্থাপনের পেছনের কারণ হিসাবে তখন তিনি জানিয়েছিলেন- ‘ঊর্ধ্বতনদের চাপে’ ফরিদপুরে কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একইভাবে নরসিংদী ও রংপুরে গড়ে তোলা আধুনিক দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা সম্প্রসারণ করা হয়। এর বিপরীতে এই দুই কারখানাতে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার মেশিনারিজ ক্রয় করা হয়েছিল । এগুলোও কোন কাজে লাগেনি। । ফরিদপুরের মতো কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এবং অপরিকল্পিতভাবে কারখানা করে এখানেও যন্ত্রপাতি আনা হয়। ফলস্বরূপ কারখানাগুলোর মেশিনারিজ বছরের পর বছর পড়ে থেকে এখন নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে মিল্কভিটার বিভিন্ন কারখানার ৬৪৮ কোটি টাকার মেশিনারিজ এখন ভাঙারির দরে বিক্রি করার উপক্রম হয়েছে। এসব কারখানা এখন মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ ও গরিব খামারিদের গলার কাঁটা হয়ে গেছে। মিল্কভিটার বর্তমান প্রশাসন এসব মরিচা পরা, নষ্ট মেশিনারিজ কেজিদরে বিক্রির চিন্তাভাবনা করছেন।
কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে,এসব মেশিন কেনা হয়েছে বিদেশ থেকে। কিন্তু মেশিন চালানোর মতো দক্ষ কারিগর দেশে নেই। আবার সে সময় বিদেশ থেকেও আনা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনার অভাব আর রাজনৈতিক চাপেই মিল্কভিটার এই দশা। শতকোটি টাকার মেশিনের লোহা এখন আর কোনো কাজে লাগছে না, চাকাও ঘোরে না।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়,এমন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে লোকসানের পর লোকসান দিতে থাকায় তৎকালীন সরকার একসময় মিল্কভিটাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ারও চিন্তা করেছিল। মিল্কভিটার অচল কারখানাগুলোকে ফের চালু করে প্রতিষ্ঠানটির ইউএইচটি মিল্ক, কনডেন্সড মিল্ক ও বোতলজাত পানির ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব ঠিকাদারদের হাতে ছাড়তে চেয়েছিল তখনকার প্রশাসন।
এমন নজির বিহীন লুটপাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মিল্কভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল জানান, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মিল্কভিটায় মোট ৬৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় । এই ৬৪৮ কোটি টাকার মেশিনারিজ এখনও টোটালি বন্ধ। এর একটিও চলে না। আমাদের যে মেশিনগুলো এখন চলছে সেগুলো ১৯৭৭-৭৮ সালে স্থাপন করা। এর বাইরে ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যেসব মেশিন ক্রয় করা হয়েছে তার একটাও চলে না। আমরা এমন অনিয়ম দূর্নীতির বিষয়টি তদন্তের জন্য দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আহ্বান জানানো হয়েছে।