কৃষি সময় ডেস্কঃ দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবণ থেকে আশঙ্কাজনকহারে মধু আহরণ কমে গেছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে এই মধুর চাহিদা বাড়লেও চলতি মৌসুমে পূর্ব সুন্দরবনে বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মধু সংগৃহীত হয়েছে।
জানা যায়, চলতি মৌসুমে (১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে) শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে মাত্র ৪২১ কুইন্টাল মধু এবং ১২৬ কুইন্টাল মোম আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। । মধু থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা এবং মোম থেকে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫২০ টাকা। এই মধু সংগ্রহে নামে ১ হাজার ৪৫৩ জন মৌয়াল।
বন বিভাগের তথ্যনুর্যায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই রেঞ্জ দুটি থেকে ৬৪৭ কুইন্টাল মধু ও ১৯৪ কুইন্টাল মোম সংগৃহীত হয়েছিল। সেখান থেকে আয় হয়েছিল যথাক্রমে ১০ লাখ ৩৫ হাজার ২০০ টাকা এবং ৪ লাখ ২৭ হাজার ২০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মধু ও মোমÑউভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও রাজস্বে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
মধু আহরণে এই বিপর্যয়ের মূল কারণ বনদস্যুেদর পুনরুত্থান। দস্যু আতঙ্ক, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের ভয়ে অনেক মৌয়াল এবার বনেই যাননি। আবার যারা গেছেন, তারাও আতঙ্কে গভীর বনে প্রবেশের সাহস পাননি এবং মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ফিরে এসেছেন। এমনটাই জানিয়েছেন বন বিভাগ।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ১ হাজার কুইন্টাল, ২০২৩ সালে ৯৫০ দশমিক ৫০ কুইন্টাল, ২০২২ সালে ১ হাজার ৫০ কুইন্টাল এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৪৪ কুইন্টাল মধু আহরিত হয়েছিল। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর থেকেই উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে।
শরণখোলার মৌয়াল ইউনুস জানান, তাদের ১০ জনের দলটি মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বনদস্যুেদর হামলার শিকার হয়। দস্যুরা তাদের দুই সঙ্গীকে অপহরণ করে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। শেষমেশ দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়। এই পরিস্থিতিতে তারা আর মধু সংগ্রহ চালিয়ে যেতে পারেননি; পান মাত্র দুই মণ মধু। খরচ ও চাঁদা মিলিয়ে আড়াই লাখ টাকার ধাক্কা সামলাতে গিয়ে পুরো দলই বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে।
বগী গ্রামের মৌয়াল শামিল হোসেন জানান, বাঘ-কুমিরের ভয়কে তুচ্ছ মনে হলেও বনদস্যুদের ভয়ে তিনি এবার বনে না গিয়ে দিনমজুরি করেছেন। অন্যদিকে জয়মনি গ্রামের মৌয়াল সাইফুল হোসেন বলেন, নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না করা হলে আগামী মৌসুমে অনেকেই আর বনে যাবেন না।
বাগেরহাটের মধু ব্যবসায়ী শিমুল শেখ জানান, গত বছর তিনি ৩৭ মণ মধু কিনলেও এবার সংগ্রহ করতে পেরেছেন মাত্র সাড়ে তিন মণ। ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। গত বছর যে মধু প্রতি কেজি এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এবার বেড়ে এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় ঠেকেছে। স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে মান নিয়ন্ত্রণের অভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল মধু খাঁটি নামে বিক্রি করে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছে।
বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, আতঙ্কের কারণে মৌয়ালের সংখ্যা দুই হাজার ২৫০ জন থেকে কমে এক হাজার ৪৫৩ জনে নেমে এসেছে। গভীর বনের যেসব এলাকায় মধুর প্রাচুর্য বেশি, সেখানে মৌয়ালরা যেতেই পারেননি। এর ফলে মধু-মোম আহরণ ও রাজস্ব আয় উভয়ই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হয়েছে।
কৃ/স/জয়