বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ আকষ্মিক দুর্যোগে উত্তাল বঙ্গোপসাগর সাগর থেকে খালি হাতে ফিরছে জেলেরা। ট্রলার বোঝাই ইলিশ নিয়ে ফেরার আশায় চলতি মাসের প্রথম দিকে সাগরে যান তারা। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস আর প্রবল ঢেউয়ে কোনোভাবেই টিকে না পেরে তাদের এই ফিরে আসা। এতে মাছ ধরা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে বেকার সময় কাটছে তাদের।
জানা গেছে, দুর্যোগের থাবায় ইলিশের আকাল বাগেরহাটের শরণখোলাসহ উপকূলজুড়েই। ভরা মৌসুমে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাছের নিলামের হাঁক-ডাকে মুখোর থাকার কথা মৎস্য আড়ৎগুলো। কিন্তু সেই আড়ৎ এখন নীরব-নিস্তব্ধ। একদিকে ঋণের বোঝা, আরেক দিকে পরবর্তীতে ট্রলার ছাড়ার পুঁজি কিভাবে যোগাড় করবেন সেই চিন্তায় পড়েছেন জেলে-মহাজনরা।
বুধবার দুপুরে শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আগেরদিন মঙ্গলবার রাতে ঘাটে এসে ভিড়েছে ৭-৮টি ট্রলার। জেলেদের মাঝে নেই কর্মচঞ্চলতা। জেলোর কেউ ট্রলারে আবার কেউ ঘাটের বেঞ্চিতে বসে পার করছেন অলস সময়।
এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ইলিশ আহরণ। সাগর ছেড়ে সুন্দরবনসহ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্তত দশ দিন কাটাতে হয় জেলেদের। দুর্যোগ কিছুটা কেটে যাওয়ার পর ফের সাগরে নামার অবস্থাও ছিল না তাদের। কারণ আশ্রয়ে থাকা বেশিরভাগ ট্রলারেই ছিল না পর্যাপ্ত জ্বালানি ও রসদসামগ্রী (খাদ্য)। নতুন করে জ্বালানি আর রসদ নিতে হলে আসতে হবে মহাজনের কাছেই। ফলে ইলিশ শূন্য ট্রলার নিয়েই একে একে ঘাটে ফেরৎ আসছে ট্রলারগুলো।
ইলিশের সংকটের কারণে দামও বেড়েছে আকাশ ছোঁয়া। জাটকার কেজি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। আর আধা কেজি বা ৮০০ গ্রাম সাইজ ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা। কেজি পার হলেই তার দাম হাকা হচ্ছে ২৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা প্রতি কেজি। দাম সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন আর নিতে পারছে না চিরচেনা সেই ইলিশের স্বাদ।
এফবি মদিনা ট্রলারের জেলে শহিদুল শিকদার বললেন, সাগরে কেবল যাইয়া এক খ্যাও (প্রথম জাল ফেলা) মারছি। এর মধ্যেই দেহি চারদিক অন্ধকার ওইয়া আইছে। তাড়াতাড়ি জাল টাইন্যা ট্রলারে উডাইয়া কূলে চইল্যা আই। এই খ্যায় ৫০টা ইলিশ পাইছিলাম। এর পর পাথরঘাটার পদ্মা স্লুইস খালে ট্রলার নিয়া দশ দিন ছিলাম। এই কয়দিন বইয়া বইয়া খাইছি। ট্রলারে খাওন ছিলনা, তাই ঘাটে চইল্যা আইছি।
ট্রলার মালিক ও আড়ৎদার মুজিবর তালুকদার হতাশা প্রকাশ করে বললেন, প্রতি ট্রিপে একেকটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকায় এক খ্যাও-দুই খ্যাও দেওয়ার পর আর সাগরে জাল ফেলাই সম্ভব হয়নি। সব ট্রলারই খালি ফিরে আসছে। কোনো ট্রলারে ৫০ কোনো ট্রলারে ১০০ ইলিশ নিয়ে ঘাটে ভিড়েছে। কোনো মহাজনেরই চালান উঠবে না। এবারের ট্রিপের পুরো চালানই লোকসান।
মৎস্যজীবী নেতা আবুল হোসেন আরো জানালেন, দুর্যোগের কারণে এবারের ট্রিপে বেশির ভাগ ট্রলারই খালি ফিরে আসছে। শরণখোলাসহ উপকূলীয় এলাকার মহাজনরা লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছেন। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিলেও কোনো প্রকার সরকারি সুবিধা দেওয়া হয় না আমাদের। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
কৃ/স/জয়