মাদারীপুর সংবাদদাতাঃ
দখল,দুষন আর ভরাটে এখন বিপন্ন মাদারীপুরের মায়াকাটা নদী। প্রবাহমান যে নদীতে এক সময় ট্রলার-নৌকা চলতো। সেই নদীতে এখন পানি থাকে না। ভরাট হয়ে গেছে বিভিন্ন অংশ। কোথাও নদীর স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমে গেছে। এমন অবস্থায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচলও। একসময়ের ব্যস্ত নৌপথ এখন অনেকটাই মৃতপ্রায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। পাঁচ্চর বাজারের আশপাশে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে নাব্যতা কমেছে। তবে বর্তমানে আড়িয়াল খাঁ ও পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের একাধিক অংশ ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এঙ্প্রেসওয়ের পাশেও নদীর প্রবাহ সরু হয়ে পড়েছে। ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের কিছু অংশে মাটি ফেলে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।
নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান শিবচর উপজেলার চর টেকেরহাট থেকে শিবচর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার নৌপথের খননকাজ উদ্বোধন করেন। ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পে আট লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করে নৌপথটি সচল করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রকল্পের আওতায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু খনন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছুদিন কাজ চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে খননকাজ শুরুর স্থানগুলোর কিছু অংশও আবার ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া উদ্যোগের সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
চর টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. খালেক বলেন, ‘আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ময়নাকাটা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন সংযোগস্থল বালু জমে পুরোপুরি ভরাট হয়ে আছে। আট-দশ বছর আগে খনন শুরু হয়েছিল। কিছুদিন কাজ চলার পর আর দেখা যায়নি। খননের কাজও পুরোপুরি হয়নি। দিন দিন নদীটি আরও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।’
মাদবরেরচর এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘ময়নাকাটা নদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থল। ওই সংযোগ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ফলে পদ্মা থেকে ময়নাকাটা নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এখন আর নেই।
পাঁচ্চর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, একসময় বর্ষায় পদ্মা থেকে প্রচুর পানি ময়নাকাটা নদীতে প্রবেশ করত। নদীপথে সহজেই পণ্য পরিবহন করা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ কমে গেছে। নদীর বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও ঘরবাড়ি। কোনো কোনো স্থানে নদী এতটাই সরু হয়ে গেছে যে সেটিকে আর নদী বলে চেনা কঠিন।
স্থানীয়দের কাছে ময়নাকাটা শুধু একটি নদী নয়, এটি একসময়কার যোগাযোগ ও বাণিজ্যের স্মৃতিও। দখল-ভরাটের কারণে সেই নদীপথ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে স্থানীয় নৌযোগাযোগের সম্ভাবনা। তাই নদীটির সীমানা চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত চিত্র বের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির বলেন, শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে এই মুহূর্তে ময়নাকাটা নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম আমাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ময়নাকাটা নদী উদ্ধার ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
কৃ/স/জয়