কৃষি সময় প্রতিবেদকঃ
মাটির উর্বরতা কমছে, বাড়ছে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা। অন্যদিকে কৃষি বর্জ্যরে বড় অংশ অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হচ্ছে কিংবা পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে। এ দুই সংকট মোকাবিলায় কৃষি বর্জ্য থেকে তৈরি ‘বায়োচার’ হতে পারে সম্ভাবনাময় সমাধান।
গবেষণায় দেখা গেছে, সুষম রাসায়নিক সারের সঙ্গে বায়োচার প্রয়োগে ভুট্টার ফলন ২৯ শতাংশ, আউশ ধানের ২৩ শতাংশ এবং বোরো ধানের ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এমনকি বায়োচার প্রলেপযুক্ত ইউরিয়া ব্যবহার করে সুপারিশকৃত মাত্রার ৭৫ শতাংশ নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করেও পূর্ণমাত্রার সমান ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সার সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কৃষকের কাছে এ প্রযুক্তি পৌঁছাতে উৎপাদনব্যয় নিরূপণ, মান নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি মাঠ গবেষণা এবং সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা।
গতকাল রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে ‘বায়োচার ফর সয়েল হেলথ, নিউট্রিয়েন্ট এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ক্রপ প্রোডাকশন’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে। বিএআরসির মৃত্তিকা ইউনিট ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ আয়োজিত কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর। প্রধান অতিথি ছিলেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুছ ছালাম।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বায়োচার শুধু মাটির গুণাগুণ উন্নয়নের উপাদান নয়; সঠিকভাবে উৎপাদন ও প্রয়োগ করা গেলে এটি পুষ্টি উপাদানের কার্যকারিতা বাড়ানো, সারের অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন মাটিতে ধরে রাখার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণায় পাওয়া ফলাফল সব ধরনের মাটি ও ফসলের ক্ষেত্রে একই হবে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক লাভজনকতা স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই করা জরুরি।
ফলন বৃদ্ধি ও সার সাশ্রয়রে সম্ভাবনাঃ
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর জানান, সুষম রাসায়নিক সারের সঙ্গে বায়োচার প্রয়োগে প্রচলিত সুপারিশকৃত সার ব্যবহারের তুলনায় ভুট্টার ফলন ২৯ শতাংশ বেড়ে হেক্টরপ্রতি ৯ দশমিক ২১ টন, আউশ ধানের ফলন ২৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৯৭ টন এবং বোরো ধানের ফলন ২১ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ০২ টনে দাঁড়িয়েছে। সরিষার ফলন বেড়েছে ১৭ শতাংশ; হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয়েছে ১ দশমিক ২৮ টন।
গবেষণায় বায়োচার ও কম্পোস্ট ব্যবহারে অ্যামোনিয়া গ্যাসের অপচয় ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ কমার তথ্যও তুলে ধরা হয়। কিছু ব্যবস্থাপনায় নাইট্রোজেন সারের অপচয় ৪০ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বায়োচার প্রলেপযুক্ত ইউরিয়া ব্যবহারে সুপারিশকৃত নাইট্রোজেন সারের ৭৫ শতাংশ প্রয়োগ করেও পূর্ণমাত্রার সমান ফলন পাওয়ার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে ফলন অক্ষুণ্ন রেখে ২৫ শতাংশ নাইট্রোজেন সার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয় উল্লেখ করে বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুছ ছালাম বলেন, বায়োচার ব্যবহারে ইউরিয়ার প্রয়োজন কতটা কমানো সম্ভব এবং এতে সরকারের কত অর্থ সাশ্রয় হতে পারে, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক লাভজনকতা প্রমাণ করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, শুধু ফলন বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে বায়োচারের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করলে চলবে না। উৎপাদন, পরিবহন ও প্রয়োগের ব্যয় বাদ দিয়ে কৃষকের প্রকৃত লাভ এবং রাসায়নিক সার আমদানিতে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের হিসাবও নিরূপণ করতে হবে।
মাটরি স্বাস্থ্য ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়ঃ
কৃষি বর্জ্য, কাঠ, খড়কুটো ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ পদার্থ সীমিত বা প্রায় অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে বায়োচার তৈরি করা হয়। এ প্রক্রিয়াকে পাইরোলাইসিস বলা হয়। উৎপাদিত বায়োচারের রন্ধ্রযুক্ত কাঠামো মাটিতে পানি ও পুষ্টি ধরে রাখতে সহায়তা করে। এর স্থিতিশীল কার্বনের একটি অংশ দীর্ঘ সময় মাটিতে থাকতে পারে।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের উপস্থাপিত গবেষণা-তথ্যে বায়োচার ব্যবহারে মাটির আপাত ঘনত্ব গড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমা, রন্ধ্রতা ৪১ শতাংশ এবং উদ্ভিদের ব্যবহারযোগ্য পানি ধারণক্ষমতা ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন মাটির ধরন, বায়োচারের গুণমান ও প্রয়োগমাত্রার ওপর নির্ভরশীল।
কর্মশালায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অনেক কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ২ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। নিবিড় চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাভাবিক জীবাণুগুলোর কার্যকারিতাও ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বায়োচার দীর্ঘমেয়াদে কার্বন ধরে রাখা এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বায়োচারকে ‘থ্রি ইন ওয়ান’ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মাটির ভৌত গুণাগুণ উন্নয়ন, পুষ্টি উপাদানের কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ এবং অম্লীয় মাটির সমস্যা প্রশমনে সহায়তা করতে পারে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাটি অম্লীয় উল্লেখ করে তিনি জানান, উপযুক্ত বায়োচার মাটির পিএইচ বাড়াতে এবং উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর অ্যালুমিনিয়ামের প্রভাব কমাতে পারে। তবে সব ধরনের বায়োচার সব মাটির জন্য উপযোগী নয়।
কৃষি র্বজ্যকে সম্পদে রূপান্তররে সুযোগঃ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বায়োচার উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে প্রযুক্তিটি ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় করা সম্ভব হলে উৎপাদনের প্রাথমিক ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কৃষকের লাভ-ক্ষতির স্পষ্ট হিসাব ছাড়া প্রযুক্তিটির টেকসই সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে এটি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কাদির মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, জামালপুরের চরাঞ্চলে বাদাম চাষে বায়োচার ও পানি সাশ্রয়ী পাইপ ব্যবহারের উদ্যোগে নানা চ্যালেঞ্জ দেখা গেছে। সুগার মিলের আখের ছোবড়া বা ব্যাগাস দিয়ে প্রচলিত চুল্লিতে বায়োচার উৎপাদনে ব্যয়ও বেশি ছিল।
তিনি বায়োচারের কাঁচামাল হিসেবে ভুট্টার মোচা সংগ্রহের পর অবশিষ্টাংশ ও শুকনো গাছ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভুট্টার চাষ বাড়ছে। কিন্তু ফসল সংগ্রহের পর এসব অবশিষ্টাংশের একটি অংশ মাঠে পড়ে থাকে কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরিকল্পিতভাবে সেগুলো সংগ্রহ করে বায়োচার উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে কাঁচামালের জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে বায়োচার ব্যবহারে মাটি থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন প্রায় ৩৮ শতাংশ কমার কথাও বলা হয়। এর স্থিতিশীল কার্বন দীর্ঘমেয়াদে মাটিতে ধরে রাখা গেলে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় করতে হলে কার্বন সঞ্চয়ের পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে পরিমাপ ও যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যয়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কাঁচা বায়োচার নয়, কম্পোস্টরে সঙ্গে প্রয়োগঃ
বায়োচারের সুফল পেতে সঠিক প্রয়োগপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক জাহাঙ্গীর। তাঁর পরামর্শ, কাঁচা বায়োচার সরাসরি জমিতে প্রয়োগ না করে কম্পোস্ট, গোবর বা উপযুক্ত জৈব সারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রস্তুত করে ব্যবহার করতে হবে। এ পদ্ধতিকে কো-কম্পোস্টিং বা প্রাক-কন্ডিশনিং বলা হয়। এতে বায়োচার পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে মাটির সহজলভ্য নাইট্রোজেন আটকে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
গবেষণার উপস্থাপনায় প্রতি হেক্টরে এক থেকে তিন টন বায়োচার নির্দিষ্ট সারিতে বা শিকড়ের কাছাকাছি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে এ মাত্রা সব জমির জন্য প্রযোজ্য নয়। মাটির বৈশিষ্ট্য, ফসল ও বায়োচারের গুণমান বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. আব্দুছ ছালাম সতর্ক করে বলেন, বাজারে ‘বায়োচার’ নামে কোনো উপাদান পাওয়া গেলেই তা জমিতে ব্যবহার করা উচিত নয়। ভারী ধাতুর দূষণসহ সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে পিএইচ, আর্দ্রতা ও বিশুদ্ধতা যাচাই করে বিজ্ঞানসম্মত জাতীয় মানদণ্ড ও পরীক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন করা জরুরি।
লা ও সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদঃ
বায়োচার প্রযুক্তির সম্প্রসারণে দুটি প্রস্তাব দেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ‘বাংলাদেশ বায়োচার অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন এবং বায়োচারের সঠিক প্রয়োগমাত্রা, ডোজ ও মান নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
কর্মশালায় বক্তারা গবেষণাগারের ফলাফল মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেনÑভিন্ন কৃষি-পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি মাঠ গবেষণা, জাতীয় মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবিধি প্রণয়ন এবং কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিশ্চিত করা।
কর্মশালায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. আফসার আলী, বিএআরসির সাবেক সদস্য পরিচালক ড. বক্তীয়ার হোসেন এবং মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফরিদুল আলম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।