যশোর সংবাদদাতাঃ
খেজুরের রস ও গুড়ের জন্য বিখ্যাত যশোরের গ্রামীণ জনপদের ব্যস্ততা বেড়েছে গাছিদের। পুরো জেলাজুড়ে কোথাও চলছে গাছের ডালপালা ছাঁটা, কোথাও চলছে রস আহরণের জন্য গাছ প্রস্তুত করার কাজ। শীতের এ আবহ ঘিরে জেলার গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। শীত মৌসুমে এখানকার খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করা রস জাল করে তৈরি করা গুড় সরবরাহ করা সহ দেশ বিদেশে। যা থেকে আয় হয় বিপুল পরিমান টাকা। কৃষক, গাছি ও ব্যবসায়ীদের আশা, চলতি মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড়কে কেন্দ্র করে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠবে।
হেমন্তের কুয়াশামাখা ভোর আর হিমেল বাতাস জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্যপটে ফিরতে শুরু করেছে খেজুর গাছের সারি, গাছিদের ব্যস্ততা আর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। যশোরের বিভিন্ন উপজেলায় চোখে পড়ছে গাছিদের ব্যস্ততা। তারা গাছ পরিষ্কার সহ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করছেন।
জানা যায়,যশোরের আট উপজেলায় খেজুরগাছ রয়েছে প্রায় ২২ লাখ ৫৯ হাজার ৭১১টি। এর মধ্যে পূর্ণবয়স্ক গাছ তিন লাখ ৪২ হাজার ৬২৬টি, পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী গাছ ১২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৩টি এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী গাছ সাত লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪টি।
জেলায় বর্তমানে তিন লাখ ২৯ হাজার ১৯৬টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কাজে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ছয় হাজার ২৫০ জন গাছি এবং ১৫ হাজার ১৪৪ জন কৃষক।
এখানকার খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করা রসেও গুড়ের সুনাম এবং চাহিদা দেশ ছপিয়ে এখন বিভিন্ন দেশে। এ কারনে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেেেয়ছে যশোরের খেজুরের গুড়। এতে স্থানীয় বাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে এর পরিচিতি বাড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে এ সম্ভাবনার আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংকট। গাছির অভাব, খেজুরগাছ নিধন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার কারণে ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী এ পেশা।
খেজুরের রস সংগ্রহের মৌসুম সাধারণত কার্তিক থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত। মৌসুম শুরুর আগে গাছের পরিচর্যা, ডালপালা ছাঁটাই, গাছের মাথা প্রস্তুত করা এবং রস সংগ্রহের সরঞ্জাম তৈরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন গাছিরা। প্রথম দফায় গাছ প্রস্তুতের পর পর্যায়ক্রমে আরও পরিচর্যা শেষে বসানো হয় মাটির হাঁড়ি। এরপর শীতের সকালে গাছ থেকে ঝরে পড়া রস সংগ্রহ করে তৈরি হয় সুস্বাদু গুড়।
মণিরামপুর উপজেলার মাসনা খানপুর গ্রামের আলি রেজা বলেন,খেজুরের রস সংগ্রহ কেবল মৌসুমি কাজ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জীবিকার অংশ। কয়েক যুগ ধরে এ পেশায় যুক্ত তারা। আশ্বিন মাসে দা’, দড়ি, তাড়া-বাইনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গোছাই। কার্তিক মাস থেকে গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করি। ফাল্গুন পর্যন্ত চলে গাছ কাটার কাজ। তিনি বলেন, এখন নতুন প্রজন্মের মধ্যে গাছি হওয়ার আগ্রহ কম।
অনেকেই পড়াশোনা কিংবা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এ কাজের ধারাবাহিকতা হুমকির মুখে পড়েছে।
সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের খেজুরগাছের মালিক আতিয়ার রহমান প্রতি বছর যশোর বিমানবন্দর বাইপাস সড়ক এলাকায় প্রায় ৬০০টি গাছ লিজ নিয়ে রস সংগ্রহ করেন। তিনি বলেন, গাছের পেছনে এখন অনেক খরচ হচ্ছে। গাছি পাওয়া যাচ্ছে না। গুড়ের দামও কম। গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় বিক্রি করেও তেমন লাভ থাকে না। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদেই এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন তিনি। তবে তার আশঙ্কা, গাছি না থাকলে ভবিষ্যতে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যে, যশোর জেলায় উৎপাদিত রসের পরিমাণ পাঁচ কোটি ২৮ লাখ ৮৮ হাজার ৬৯৫ লিটার এবং তা থেকে গুড় উৎপাদন হয় সাত হাজার ৯০ মেট্রিক টন। উৎপাদিত গুড়ের মূল্য প্রায় ১১১ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অন্যান্য আনুষঙ্গিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম মিলিয়ে এবার এ খাতের সম্ভাব্য মূল্য ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) সুলতানা আফরোজ বলেন, যশোর বাংলাদেশের অন্যতম জেলা, যেখানে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদন হয়। জেলায় প্রায় সাড়ে ২২ লাখ খেজুরগাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় উৎপাদন করছেন চাষিরা। তিনি জানান, কৃষকদের বসতবাড়ি, পতিত জমি ও রাস্তার পাশে খেজুরগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, যশোরের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোর মধ্যে খেজুরের রস ও গুড় অন্যতম। এ পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিবছর গাছিরা গাছ কাটেন ও রস সংগ্রহ করেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হয়। তিনি জানান, গাছিদের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গাছি সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে তাদের জন্য বিভিন্ন ঘোষণা দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারি সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
যশোরের খেজুরের গুড় কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি গ্রামীণ জীবন, লোকজ সংস্কৃতি ও বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য। শীতের সকালে গাছ থেকে রস নামানো, আগুনের তাপে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি এবং সেই গুড়ের ঘ্রাণ-সব মিলিয়ে এ শিল্পের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
জিআই স্বীকৃতি এ ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু শুধু স্বীকৃতি দিয়ে শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন খেজুরগাছ সংরক্ষণ, অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধ, গাছিদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় যুক্ত করা এবং উৎপাদন ও বিপণনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
কৃ/স/জয়