জয়পুরহাট সংবাদদাতাঃ
জয়পুরহাটে আলু চাষীদের মাঝে বোবা কান্না বিরাজ করছে। আলু উৎপাদন করে একবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা। আবার দাম না থাকায় সেই আলু লাভের আশায় হিমাগারে রেখে এখন তারা আরো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। দাম না বাড়ায় তারা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। ৬০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদন ও হিমাগারে সংরক্ষণে গড়ে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা। অথচ বাজারে মিলছে মাত্র ৮৫০ টাকা। ফলে প্রতি বস্তায় তাদের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। জয়পুরহাট জেলার ২২টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ২ লাখ টন আলু বর্তমান দরে বিক্রি হলেও কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মোট লোকসান হবে ১৩৩ কোটি টাকার বেশি। যা তাদের দেনায় দায়ে ফেলছে।
জানা যায়,এ জেলার ২২টি হিমাগারের মধ্যে কালাই উপজেলায় রয়েছে ১৪টি। ক্ষেতলালে চারটি এবং পাঁচবিবি ও আক্কেলপুরে রয়েছে দুটি করে হিমাগার। এসব হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ টন আলু।
কালাই উপজেলার এম ইসরাত হিমাগারে চলতি বছর ২ লাখ ৩০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতি বস্তার জন্য ৩৮০ টাকা হিমাগার ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় পড়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮৫০ টাকায়। ফলে সংরক্ষণ করা আলু বিক্রি করলেই বস্তাপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
প্রতি বস্তায় ৬০ কেজি ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার বস্তা। প্রতিটি বস্তায় গড়ে ৪০০ টাকা লোকসান হলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে হিমাগারভেদে আলু কেনার দাম ও আনুষঙ্গিক খরচে পার্থক্য থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
লোকসানের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সময়ের চাপও। আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগারগুলো খালি করতে হবে। হাতে সময় আছে প্রায় ৬৪ দিন। এর আগেই বাজারে উঠতে শুরু করবে আগাম জাতের নতুন আলু। তখন পুরোনো আলুর চাহিদা ও দাম আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এমন চিন্তায় জেলার আলু চাষীরা চোখে অন্ধকার দেখছেন। এতোনি তারা আশায় ছিলো ভাল দাম পাবে। যা দিয়ে উৎপাদন খরচ উঠবে। কিন্তু এতোদিনে দাম তো বাড়েইনি,উল্টো হিমাগারের ভাড়া বাবাদ আরো বাড়তি টাকা গুনতে হবে তাদের। যা আলু বিক্রি করে শোধ হবে না। এ নিয়ে চাষীদের মাঝে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
হিমাগারে আলু রেখেছেন কালাই উপজেলার পুনট এলাকার ব্যবসায়ী মিঠু ফকির, মেহেদুল চৌধুরী ও পাঁচশিরার বাবু। মিঠু ফকির ৫ হাজার, মেহেদুল চৌধুরী ৩ হাজার এবং বাবু ৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। মিঠু ফকির বলেন, ‘বাজারে আলু বিক্রি করে মূল খরচই ওঠানো যাচ্ছে না।’ সামনের দিনগুলোয় দাম বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন না তিনি। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই হয়ে উঠছে কঠিন।
শুধু বড় ব্যবসায়ীরাই নন, একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষকেরাও। গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলী পরে দাম বাড়বে, এই আশায় আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০ বস্তা আলু বিক্রি করে তাকে ৮ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তার মতো অনেক কৃষক এখন কম দামে সংরক্ষিত আলু বিক্রি করা ছাড়া কার্যত কোনো পথ দেখছেন না।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজু আলম জানান, গত মৌসুমে জয়পুরহাটে আলুর উচ্চফলন হয়েছিল। এরপর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেন। বর্তমানে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি করতে গিয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
কৃ/স/জয়