কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 9, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

চলনবিলে শামুক-ঝিনুক নিধন, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতাঃ 
নির্বিচারে শামুক আহরণের ফলে সিরাজগঞ্জ,পাবনা, নাটোর জেলার ১৪টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত চলনবিল এলাকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এক শ্রেনীর মানুষ এই শামুক শিকার করে চড়া দামে বিক্রি করায়  প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতার চরম ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য এই কর্মকান্ড হলেও স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে নির্বিকার। 

চলনবিলেও বিশাল মুক্ত পানিতে এক সময় প্রচুর শামুক পাওয়া যেত। যা স্থানীয়রা সংগ্রহ করে হাঁসের খাবার দিতেন। এমনকি বন্যার পানি নেমে গেলে সেই শামুক সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে ডোবা নালায় ডুবিয়ে রেখে বছরজুড়ে হাঁস পালন করতেন খামারীরা। এতে তাদের অর্থ সাশ্রয় হতো। 

চলনবিলে প্রচুর শামুক পাওয়ায় বিল কেন্দ্রিক শত শত হাঁসের খামার পরিচালনা করেন বেকার যুবকরা। বছরজুড়ে চলনবিলেও ছোট-বড় খাল বিলে প্রচুর শামুক থাকায় পরির্যায়ী শামুকখোল পাখির বিচরনও চোখে পড়ার মতো। তবে গত কয়েক বছর ধরে সেই শামুকের উপর নজর পড়েছে স্থানীয় এক শ্রেণীর মানুষের। তারা দল বেধে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনভর শামুক আহরণ করে বিক্রি মোটা টাকায় বিক্রি করছেন। 

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় এই শাকুক আহরণ এবং বিক্রি এখন রমরমা। বন্যার শুরু থেকেই চলছে এই উপজেলায় চলছে শামুক নিধন। শুধু তাড়াশই নয়।  চাহিদা বেশি থাকায় চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও সিংড়া উপজেলায় গড়ে উঠেছে ৫০টিরও বেশি আড়ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন শামুক-ঝিনুক চালান করা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে।

আড়তদারেরা প্রতি বস্তা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় কিনে নিয়ে ঘেরমালিকদের কাছে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
চলনবিল থেকে আহরিত শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ও মৎস্যঘেরে। বিশেষ করে ঘেরের চিংড়ির প্রধান ও সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে এর মাংস ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শামুক-ঝিনুকের খোলস গুঁড়ো করে ফিশমিল, পোল্ট্রি ফিড এবং চুন তৈরি করা হয়। 

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাঁড়ি থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ চলে। তবে আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস হলো মূল মৌসুম। ধান, পাট বা কচুরিপানার ওপর ভেসে থাকা শামুক জাল দিয়ে তৈরি ফাঁদ দিয়ে টেনে তুলে ডিঙি নৌকায় জমা করা হয়। তীব্র রোদ বাড়ার আগেই ভোর থেকে সকালের মধ্যে শামুক সংগ্রহ করতে হয়, কারণ রোদ বাড়লে এরা পানির নিচে চলে যায়। বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় চলনবিল অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে শামুক কুড়ানো। 

তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া জানান, পরিবার নিয়ে প্রতিদিন দুই বস্তা শামুক তুলে তিনি দিনে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ টাকা আয় করেন, যা দিয়ে তাদের পুরো সংসার চলে। একই এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামীর সংসার চালাতে আসমা বেগম প্রতিদিন নদী-বিল থেকে এক বস্তা শামুক কুড়িয়ে পান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। আবার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুল শামুক বিক্রি করেই জোগাড় করছে তার পড়াশোনার খরচ।

দরিদ্র মানুষের সাময়িক আর্থিক সংস্থান হলেও চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৃষি সুরক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত শামুক-ঝিনুক নিধন বন্ধ করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদারকি ও সচেতনতা সৃষ্টি না করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, চলনবিল অঞ্চলে মূলত 'অ্যাপেল স্নেল' বা আপেল শামুক প্রজাতি বেশি ধরা হয়। এগুলো জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষা শেষে মাটিতে মিশে শামুক পচে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অবাধে শামুক নিধনের ফলে জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা কমছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। 

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আল-আরাফাহ ব্যাংক ফিরিলো পুরোনো মালিকদের হাতে

1

বালু উত্তোলন ঠেকাতে মিরসরাইয়ে ৯ শ্যালো মেশিন ধ্বংস

2

৭০০ কলাগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা

3

আদালতে সশরীরে হাজির মহিষ

4

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে চড়া মাছের বাজার

5

শখের বাগান থেকে রাখির আয় লাখ টাকা

6

দেশে খাদ্য মজুত ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করা হচ্ছে

7

৩৩ কেজি বাঘাইড় বিক্রি হলো ৫৬ হাজারে

8

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান ডিআরইউয়ের

9

১৫৫ কেজির কোরাল মাছ দেখতে ভিড়

10

বৃহত্তর খুলনার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল কল

11

৯৮ প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণের উদ্যোগ

12

বদলে যাওয়া ক্যাম্পাস

13

আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রী

14

বিষখালী নদীতে ভেসে উঠল মৃত ডলফিন

15

আগাম শিমে বাড়তি লাভের আশা কৃষকদের

16

ভোমরা বন্দর দিয়ে ৩১৩ কোটি টাকার টমেটো আমদানি

17

মালচিং প্রযুক্তিতে সবজি উৎপাদনে বিপ্লব

18

নেপালি কলা চাষে আসিফের ভাগ্যবদল

19

তালগাছ লাগানোই তার নেশা

20