কৃষি সময়
প্রকাশ : Sep 15, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শামুক না থাকায় কমছে অতিথি পাখি

নড়াইল সংবাদদাতাঃ
নড়াইলে বিভিন্ন বিল ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে সংগ্রহ করায় শামুকের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এতে এসব বিলে আসা পরির্যায়ী পাখি সহ দেশি প্রজাতির অনেক পাখি খাবার সংকটে পড়েছে। এই সময় বিল জলাশয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখা গেলেও এবার তা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়রা বলছেন,নির্বিচারে শামুক সংগ্রহের কারনেই এই ছন্দ পতন ঘটেছে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল।

জানা যায়,নড়াইলের বিলগুলোতে একসময় শামুকের বেশ প্রাচুর্য ছিল। বর্ষা ও শীত- এই দুই মৌসুমে বিলের পানিতে, কাদায় ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে অসংখ্য শামুক দেখা যেত। এগুলো ছিল বিলের জলজ পরিবেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ ও পরিযায়ী পাখির খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই শামুক। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিল ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ করায় সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়ায় বিলগুলোতে শামুকের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকেই দলবেঁধে শামুক সংগ্রহ করছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ। শামুক সংগ্রহ করতে পিছিয়ে নেই শিশুরা পর্যন্ত। কেউ হাতে, কেউ ঝুড়ি বা বস্তা ব্যবহার করে বিলের অগভীর পানি ও কাদামাটি থেকে শামুক তুলে নিচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে উঠছে বিপুল পরিমাণ শামুক। 

শামুক কমে যাওয়ায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পুরো জলজ পরিবেশে। কমছে বিভিন্ন পাখির খাদ্যের প্রাপ্যতা, বদলে যাচ্ছে বিলের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল। কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। 
স্থানীয়দের ভাষ্য, সংগৃহীত শামুকের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়। আবার বড় একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শামুকের খোসা ও মাংস বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ভালো চাহিদা রয়েছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর আহরণ।

নড়াইলের বিভিন্ন বিল শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। প্রতি বছর শীতের শুরুতে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এসব জলাশয়ে আসে। তবে স্থানীয়দের দাবি, আগের তুলনায় অনেক বিলেই অতিথি পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। শামুক নিধনের ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় বিলগুলোতে শীত মৌসুমে পাখির বিচরণ কমে গেছে বলেই তাদের ধারণা|

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, বিল থেকে যারা শামুক কুড়াচ্ছে, ছোট শামুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই ছোট শামুক তুলে নেওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিল থেকে শামুকের স্বাভাবিক অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরাও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে অসংখ্য জীবের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর। শামুকও সেই ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবে শামুক ব্যবহৃত হয়। আবার জলজ পরিবেশে জৈব পদার্থের প্রক্রিয়াকরণ ও পুষ্টি উপাদানের পুনর্ব্যবচনেও শামুক বড় ভূমিকা রাখে। ফলে কোনো বিল বা জলাশয় থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ শামুক সরিয়ে ফেললে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য স্তরেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামুক সংগ্রহের সময় অনেক ক্ষেত্রেই বিলের তলদেশের কাদা ও পলি ব্যাপকভাবে নাড়াচাড়া করা হয়। এতে পানিতে অতিরিক্ত পলি ও জৈব পদার্থ মিশে পানির স্বচ্ছতা কমতে পারে। একই সঙ্গে বিলের তলদেশের ক্ষুদ্র জীব ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, শামুক সংগ্রহের পর অনেক স্থানে শামুকের খোসা, মৃত শামুক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে রাখা হয়। এগুলো পচে গেলে পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি এবং পানির গুণগত মানের অবনতি ঘটতে পারে।

পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, নড়াইলের বিলগুলোতে শামুকের নির্বিচার আহরণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শামুকের প্রজনন, জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এবং অতিথি পাখির খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক পানির ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। পানির নিচে যে দূষিত পদার্থ থাকে, সেগুলোকে পরিশোধিত করে পানিকে বিশুদ্ধ রেখে মাছের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। তবে দিন দিন কিছু অসাধু মৎস্যচাষি নির্বিচারে এই শামুক নিধন করে মাছের (চিংড়ির) খাবারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। যারা এই কাজগুলো করছে, তাদের আমরা নিরুৎসাহ করছি এবং পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নড়াইলের উপপরিচালক কৃষবিদ মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, শামুক মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে। শামুক মাটির নিচে চলাফেরা করার সময় মাটি আলগা করে, যার ফলে মাটিতে বাতাস চলাচলের পথ তৈরি হয়। এ ছাড়া এদের বর্জ্য মাটিতে মিশে মাটির উর্বরাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিষখালী নদীতে ভেসে উঠল মৃত ডলফিন

1

সিরাজগঞ্জের সরিষাকেন্দ্রিক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

2

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ময়নাকাটা নদী

3

তরমুজ চাষে জাকিরের বাজিমাত

4

ধান গবেষণায় নতুন উদ্যোগ এলএসটিডির রাইস গার্ডেন

5

টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে শিক্ষার্থীদের চারা বিতরণ

6

চাঁদপুরে জেলেদের ভিজিএফের চাল ‘আত্মসাতের চেষ্টা’

7

সারা দেশে সার নিয়ে কৃষকের অসন্তোষ বাড়ছে

8

আখচাষীদের ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

9

অসময়ে তরমুজ চাষে নতুন সম্ভাবনা

10

বস্তায় আদা চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা

11

৫ একর বনভূমি উদ্ধার

12

ভাসমান বেডে উৎপাদন হচ্ছে কোটি টাকার সবজি চারা

13

বাকৃবি এগ্রি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্সের সভাপতি খালিদ,সম্পাদক শ

14

লবণাক্ত জমিতে ধানে বাম্পার ফলন

15

দেশের ২৪ জেলায় বইছে শৈত্যপ্রবাহ,সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি

16

পুকুরে মাছ চাষাবাদের গ্রাম

17

কাজিপুরে দাম না থাকায় কমছে কাউনের চাষ

18

আকস্মিক পরিদর্শনে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী, তোড়জোড় খামারবাড়ি

19

কৃষি প্রকল্পের এক পিডির বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ

20