রংপুর সংবাদদাতাঃ
লোকশানের ভয়ে হিমাগাার থেকে আলু তুলছে আসছে না কৃষকরা। এতে হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন মালিকরা। কৃষকদের থেকে আলু রাখার ভাড়া না পাওয়ায় অনেক মালিক হিমাগার মালিক এখন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারছেন না। এমন অবস্থায় রংপুরের ৪২টি হিমাগার মালিক চরম সংকটে পড়েছেন।
জানা যায়,রংপুরে ৪২টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে এখনো প্রায় দেড় শ’টন আলু মজুদ রেখেছেন কৃষকরা। কৃষকদেও প্রত্যশা ছিলো বাজারে আলুর দাম বাড়লে হিমাগার থেকে বের করে বিক্রি করে লাভবান হবেন। কিন্তু এ বছর শুরু থেকে আলুর বাজার নিম্নমুখি থাকায় কৃষকরা হিমাগারে রাখা তাদের আলু বের করছেন না। এমনকি ভাড়াও দিচ্ছেন না। তার আলুর খোঁজও িিনতে আসছেন না। এমন অবস্থায় মাসের পর মাস হিমাগার মালিকরা চড়া দামে বিদ্যুত খরচ করে আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে এখন চরম বিপাকে পড়েছেন।
হিমাগারে আলু রাখ কৃষকদের সাথে কথা হলে তারা জানান,আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে কেজিপ্রতি ১৭ টাকা। এর মধ্যে কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে খরচ হয়েছে ২৪ টাকা। অথচ হিমাগার থেকে বের করে বিক্রি করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টাকায়। হিমাগার ভাড়া এবং উৎপাদন খরচ বাদ দিলে কৃষকদের রাখা আলু বিক্রি করলে প্রতি কেজিতে ১২ টাকা লোকশান গুনতে হচ্ছে। এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে আসতে শুরু করবে নতুন আলু। ফলে সংরক্ষিত আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এ অবস্থায় অনেকেই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ পরিস্থিতে রংপুরের ৪টি হিমাগার মালিক প্রতি মাসে বিদ্যুত বিল সহ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে যবিপুল পরিমাণ টাকা লোকশান গুনছেন।
টানা লোকশানের পরও আলু চাষাবাদ করে এবারও নতুন করে লোকশানে পড়ায় দিশেহারা হাজার হাজার আলু চাষী।
ক্ষোভ প্রকাশ কওে অনেক আলু চাষী বলেন, এ বছর বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ আলু উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগারের ভাড়া ও সংরক্ষণ খরচ। কিন্তু বাজারে আলুর পাইকারি দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
রংপুর নগরীর রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন। কারণ, এ মুহূর্তে আলু উত্তোলন করলে প্রতি কেজিতে তাঁর লোকসান হবে কমপক্ষে ১২ টাকা। তিনি জানান, নগরীর সবুজ বাংলা ও অপু মুন্সী হিমাগারে মোট ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া, বস্তা প্যাকিং ও বহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে অন্তত ২৪ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু তিনি নন, তার এলাকার অনেক কৃষকই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন প্রায় বন্ধ রেখেছেন। গত বছরও শেষ পর্যন্ত তিনি আলু উত্তোলন করেননি। এতে তার প্রায় আট লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চেংমারী এলাকার কৃষক শওকত আলী জানান, গত বছরও আলু চাষ করে লোকসান গুনেছেন তিনি। এবার ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঋণ করে হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে আলু উত্তোলন করলে গাড়িভাড়া ও হিমাগারের ভাড়াই উঠবে না। উল্টো নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। তাই হিমাগারে রাখা আলু পড়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ বেলতলী এলাকার কৃষক হায়দার আলী জানান, কিছুদিন আগে তিনি হিমাগার থেকে ২৫০ বস্তা আলু তুলে বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি আলু বিক্রি করেছেন ১৫ টাকা দরে। বর্তমানে আলুর দাম ১২ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট ৫০০ বস্তা আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। বড় অঙ্কের টাকা লোকসানের আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত বাকি আলু আর তুলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বদরগঞ্জের শাহজালাল হিমাগার এবং গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা ২৪ হাজার মেট্রিক টন। সংরক্ষিত আলুর ৫০ শতাংশ এখনো পড়ে আছে। হিমাগার গেটে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১২ টাকায় বিক্রি হওয়ায় লোকসানের ভয়ে কৃষকদের আলু উত্তোলনে আগ্রহ নেই। এতে হিমাগারমালিকদেরও লোকসানে পড়তে হবে বলে জানান তিনি।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার ৪২টি হিমাগারে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারে দাম কম হওয়ায় আলু উত্তোলনে অনীহা দেখা দিয়েছে সংরক্ষণকারীদের মধ্যে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন আলু হিমাগারগুলোতে মজুত আছে বলেও সূত্র জানায়।
কৃ/স/জয়