কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 29, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

‘সীড ভিলেজ’ হচ্ছে ৪০ উপজেলায়

কুমিল্লা সংবাদদাতাঃ 
কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪০ উপজেলায় গড়ে তোলা হচ্ছে ‘সীড ভিলেজ’। এর লক্ষ্য হচ্ছে কৃষকদের নিজস্ব জমিতে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো, স্থানীয় বীজব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনে দুর্যোগকবলিত এলাকায় দ্রুত বীজের জোগান নিশ্চিত করা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের মানসম্মত বীজের সংকট কমবে। একই সঙ্গে বীজের জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠান ও বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকেরা নিজেরাই বীজ উৎপাদক ও সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন ২ শতাংশ বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি অন্তত ৩০ শতাংশ নারীসহ কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্রজেক্ট (বি-স্ট্রং)-এগ্রিকালচারাল সিস্টেম রিস্টোরেশন কমপোনেন্ট’-এর মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এটি বাস্তবায়ন করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তন ও আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাত পুনরুদ্ধার, মানসম্মত বীজের সংকট দূর করা এবং কৃষকদের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

এ কার্যক্রমে উন্নতমানের ভিত্তিবীজ বা ফাউন্ডেশন সিড এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত উন্নত জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব এলাকায় বছরে দুই মৌসুমে ধান এবং অন্য মৌসুমে গম, ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় ফসল চাষের সুযোগ রয়েছে, সেসব এলাকাকে বীজ প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় ধান, গম, ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় ফসলের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্তত তিনটি করে বীজ প্রযুক্তি গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।

বীজ উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন ফসলের ওপর প্রদর্শনী স্থাপন করা হচ্ছে। ধানের ক্ষেত্রে দুই মৌসুমে ১০ বিঘা করে মোট ২০ বিঘা জমিতে আবাদ করা হবে। এতে অংশ নেবেন পাঁচ থেকে ১০ জন কৃষক। গম, ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের প্রতিটির জন্য তিন বিঘা করে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে অংশ নেবেন এক থেকে তিনজন কৃষক।

প্রকল্প কার্যালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, নির্ধারিত জমিতে অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানসম্মত বীজ উৎপাদন সম্ভব হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, দুই হাজার ৪০০ বিঘা জমি থেকে এক হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন ধানবীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ৩৬০ বিঘা জমিতে ১৩৫ মেট্রিক টন গমবীজ, ৩৬০ বিঘায় ৭২ মেট্রিক টন ডালবীজ এবং ৩৬০ বিঘা জমিতে ৫৭ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন তেলবীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ১২০ বিঘা জমি থেকে ৪ দশমিক ৮ মেট্রিক টন মসলাজাতীয় ফসলের বীজ এবং ১২০ বিঘা জমি থেকে ১২০ মেট্রিক টন কন্দ উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে।

উৎপাদিত বীজের গুণগত মান বজায় রাখা ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে ময়েশ্চার মিটার, বীজ সংরক্ষণ পাত্র, ত্রিপল, বস্তা সেলাইয়ের যন্ত্র, সিলার মেশিন, ওজন পরিমাপক যন্ত্র এবং বস্তা বা প্যাকেট সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত দুই হাজার ৫০০ কেজি ধানবীজ, ৬০০ কেজি গমবীজ, ২০০ কেজি ডালবীজ, ১০০ কেজি তেলবীজ এবং দুই কেজি পেঁয়াজবীজ অথবা ২০০ কেজি পেঁয়াজের কন্দ সংরক্ষণ করবেন কৃষকেরা।

বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (এসসিএ) ও প্রকল্পের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে মাঠ পরিদর্শন করছেন। প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত তিনবার রোগিংয়ের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গাছ অপসারণের কার্যক্রম রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সঠিক দূরত্ব বজায় রেখে চারা রোপণ, স্বাতন্ত্র্যকরণ দূরত্ব নিশ্চিত করা, আগাছা দমন এবং সুষম সার প্রয়োগের মতো প্রযুক্তিগত বিষয় অনুসরণ করা হচ্ছে।

বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বীজের লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কোন কৃষক কার কাছে কত পরিমাণ বীজ বিক্রি বা বিনিময় করছেন, তা নিবন্ধনে লিপিবদ্ধ করবেন সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও)। এসব তথ্যের প্রতিবেদন প্রতি তিন মাস পরপর প্রকল্প কার্যালয়ে পাঠানো হবে। এর ফলে কোন এলাকায় কী পরিমাণ বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কোথায় কত বীজ সংরক্ষিত রয়েছে এবং কৃষকদের মধ্যে কী পরিমাণ বীজ লেনদেন হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ধারণা পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বীজের সংকট দেখা দিলে স্থানীয় পর্যায় থেকে বীজ সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হবে।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষক আবু আহম্মেদ বলেন, আমরা এখন নিজেরাই নিজেদের বীজের চাহিদা পূরণ করতে পারছি। পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করতে পারছি। সীড ভিলেজের মাধ্যমে ভালো মানের বীজের ঘাটতি পূরণ হবে বলে আশা করছি। আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ কিনে অনেক সময় প্রতারিত হতাম। বীজ প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে এ সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে।

বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, দেশের কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সব উপজেলায় (৪০) ‘সীড ভিলেজ’ গড়ে তোলা হবে। বীজ প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে গুণগত ও মানসম্মত বীজ উৎপাদক দল গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি শুধু একটি সাময়িক কৃষি উদ্যোগ নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় কৃষকদের নিজস্ব বীজ উৎপাদক ও বিক্রেতা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে যা বলল নয়াদিল্লি

1

বিক্রয়কেন্দ্র না থাকায় সংকটে লতিরাজ কচুর সম্ভাবনা

2

রেড চিটাগাং ক্যাটল জাত সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি

3

এক উপজেলাতেই শতকোটি টাকার তুলা চাষ

4

ঈদের ছুটি শেষে নির্ধারিত সময়ে অফিসে ফিরতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের

5

মেঘনায় মিলল ১৬ কেজির কোরাল

6

প্রকল্প শুরুর ৩ বছর ৩ মাস পর অনুষ্ঠিত হলো ১৫ সংস্থার সমন্বয়

7

ইলিশ ছাড়াই ফিরছে শূন্য ট্রলার

8

ঝিনাইদহে সারের ডিলার পয়েন্ট ঘেরাও

9

চাঁদপুরে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে জনসচেতনতামূলক সভা

10

ব্যাটারি পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণ

11

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে তৃতীয় গ্রেডের পদোন্নতিতে জ্যোষ্ঠতা

12

লক্ষীপুরে নির্মাণ হবে বাফার গুদাম

13

মহেশপুরে রাস্তার পাশে ময়লার ভাগাড়ে ভোগান্তি

14

ওডিস চাকমার মাশরুম বীজ যাচ্ছে সারা দেশে

15

সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতায় হাজার বিঘা ফসলি জমি

16

সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে কাউনের বাম্পার ফলন

17

গোমতীর চরে মুলার বাম্পার ফলন

18

কৃষকের ৪ শতাধিক ফলদ কলাগাছ কাটলেন প্রতিপক্ষরা

19

সোনালি ফসল কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা

20