স্টাফ রিপোর্টারঃ সারা দেশে জুলাই মাসজুড়ে হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৩টি অধিদপ্তরে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন জেলায় এই ক্ষয়-ক্ষতিতে সর্বশান্ত হয়েছে অনেক কৃষক,খামারী ও মাছ চাষী। এমন অবস্থায় সারা দেশের বাজারে কৃষি,মৎস্য,প্রাণি খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিটি জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬ জুলাই থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় অতি ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। ডুবেছে শাক-সবজির ক্ষেত। নষ্ট হয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা। কৃষির পরেই বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। এ খাতে ৩২ জেলায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪১০ কোটি টাকার। তা ছাড়া ৫ জন জেলে নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন। প্রাণিসম্পদ খাতে ১৬ জেলায় ক্ষতি হয়েছে ৮১ কোটি টাকার।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, দেশের ৪৩ জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্র জানায়, ৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশের ৪৩ জেলায় বন্যা আঘাত হানে। এতে ক্ষতি হয়েছে ৪৭৭কোটি ৯৭ লাখ টাকার ফসলের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬০ জন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শাক-সবজির আবাদ। বন্যায় ৮ হাজার ৮৩৬ দশমিক ১৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় শাক-সবজির উৎপাদন কমবে ৮৭ হাজার ৯৬৭ টন। তাতে আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা হচ্ছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৬৩ জন।
ডিএই সূত্র জানায়, চলতি আউশ মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ হাজার ১৩৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর অর্থাৎ ২.৯৫ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশের আবাদ।
এ বছর ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪২ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছিল। সেখানে ১২ হাজার ৭৮৩ দশমিক ৭০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ধানের উৎপাদন কমবে ৩৬ হাজার ২৬৬ মেট্রিক টন। তাতে ৭৪ হাজার ৪৩৯ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ১৭১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
রোপা আমন বীজতলা রোপণ করা হয়েছিল ৫০ হাজার ৫১৬ হেক্টর জমিতে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৭৪৬ দশমিক ১৩ হেক্টর জমি। তাতে ধানের উৎপাদন কমবে ৯৪৯ টন, এতে ৪৫ হাজার ৯২৭ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হবে ১ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। বোনা আমনের বীজতলা করা হয়েছিল ২৫ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ হেক্টর জমি।
তাতে উৎপাদন কমতে পারে ৫৬ টন এবং তাতে ১৫০ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াবে ৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়াও বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আদায় ২২৮৭ কোটি টাকা, হলুদে ৯৭৪, ফলবাগানে ৭৩৭, পানে ৮২২, মরিচে ৪৭৯, ধইঞ্চায় ৯১, তরমুজে ৮৫ কোটি টাকা।
এদিকে ডিএই সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬১ হাজার ৭৬৭ জন কৃষককে ৫ কেজি করে ধানের বীজ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সরকারিভাবে ১৪ দশমিক ৮৪ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এক হেক্টর জমির বীজতলা থেকে ২০ জন করে কৃষক উপকৃত হবে।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামে বলেন, “বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকবান্ধব। আমরা চিন্তা করছি এমন বীজ আনব-যাতে বন্যা হওয়ার আগেই ধান কেটে নেওয়া যায়। আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিবীমার আওতায় আনার চিন্তা চলছে”।
বন্যায় মৎস্য খামার, ঘের, পুকুর ও দিঘির মাছ ভেসে গেছে। ভেঙে গেছে অবকাঠামোও। মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, ১৯ জুলাই পর্যন্ত মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। বন্যায় ৩২টি জেলার ১৬৩টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৩৮ হাজার ২০২টি খামার, ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
এদিকে বন্যায় গরু, ছাগল, হাঁস- মুরগিসহ প্রাণিসম্পদ খাতও বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা বিভাগের ১৬ জেলায় ১১ হাজার ১৪৬টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাতে ৮১ কোটি ৬৫ লাখ ১৫ হাজার ৪২০ টাকার অর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় মারা গেছে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার পশু-পাখি।
প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৬ জেলায় ৪ হাজার ৮৪২টি খামারের ৩৬ হাজার ২৪৪টি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। হাঁস-মুরগির ৬ হাজার ৩০৪টি খামারে ৯ লাখ ৫৪ হাজার ৬২১টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তা ছাড়া পশু-পাখির দানাদার খাবার, গবাদিপশুর খড় ও কাঁচা ঘাসের জমি নষ্ট হয়েছে। সকল ধরনের ক্ষতি মিলে ৮১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ক্ষতি দাঁড়িয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বীজ ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধে বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে বন্যা-পরবর্তী সময়ে রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়”।