কৃষি সময়
প্রকাশ : Aug 1, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কংক্রিটের নগরে সবুজের কারিগর রকিবুল আমিনের গল্প

কংক্রিটের ইট-পাথরের ধূসর নগরে প্রকৃতিকে ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে যে কজন মানুষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, মো. রকিবুল আমিন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে একজন সফল উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং পরিবেশবান্ধব নগর সবুজায়ন প্রতিষ্ঠান ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। কুষ্টিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা রকিবুলের শৈশব কেটেছে গাছপালা আর ফুলের সুবাসে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই নিজ ঘরের আঙিনায় গোলাপগাছ লাগিয়ে সবুজায়নের যে গল্প তিনি শুরু করেছিলেন, আজ তা জাতীয় পর্যায়ে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করা রকিবুল আমিনের কাজের মূল প্রেরণা—কংক্রিটের খাঁচায় বন্দী নগরবাসীকে আবার প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরিয়ে নেওয়া। তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার পথটি সহজ ছিল না। ২০০৪-০৬ সালের দিকে শাহবাগের ফুল বাজারে খুব অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেন। ২০০৬ সালের ফাল্গুনে ১৪ হাজার টাকার ঋণের ফুল কিনে বৃষ্টির কারণে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন। তবুও দমে যাননি। ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ‘একেশিয়া’ নামে ইনডোর প্লান্ট ও ফুলের শপ চালু করলেও পরবর্তীতে মার্কেট কর্তৃপক্ষের নতুন নিয়মে দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়।

সকল বাধা অতিক্রম করে ২০১৯ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠানটিকে। তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশে ল্যান্ডস্কেপিং আজ একটি সম্ভাবনাময় ও স্বাবলম্বী শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি ও তাঁর দল ১০০টিরও বেশি বড় ল্যান্ডস্কেপ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম, আর্মি হেডকোয়ার্টার্স, নিকুঞ্জ লেক এবং জিওন রিসোর্টের কাজ উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন রকিবুল। ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রতি ১০ বছর পর পর আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘আন্তর্জাতিক হর্টিকালচার ফেয়ার’ (Floriade Expo)-এ বাংলাদেশ স্টল তাঁর ল্যান্ডস্কেপিং কাজের সুবাদে দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন করে।

রকিবুল আমিন ‘জিরো সয়েল’ (কোনো খোলা মাটি খালি না রেখে ঘাস বা লতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া) ধারণা এবং ‘গার্ডেন মিশন’-এর প্রবক্তা। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০০ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিকের নিয়মিত কর্মসংস্থান হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, উদ্ভাবন ও ল্যান্ডস্কেপ শিল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’ (বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখা)। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা বলেছে কৃষি সময়। নিচের তার বিশেষ সাক্ষাৎকারটি দেওয়া হলো-

কৃষি সময়: ‘কৃষি সময়’-এর পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। শৈশবের সেই গাছপালার প্রতি ভালোবাসা থেকে আজকের সফল ল্যান্ডস্কেপ উদ্যোক্তা—এই রূপান্তরের অনুভূতির শুরুটা কেমন ছিল?

রকিবুল আমিন: ধন্যবাদ। আসলে প্রকৃতির প্রতি টানটা আমার রক্তে মিশে আছে। কুষ্টিয়ার মনোরম পরিবেশে আমার শৈশব কেটেছে। তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই বাড়ির আঙিনায় নানারকম ফুলের বাগান করতাম। পরবর্তীতে থিয়েটার ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকলেও মাথায় একটা চিন্তাই কাজ করত—সবাই যেভাবে সাধারণ বাগান করে, আমি যদি একটু অন্যভাবে, একটু নান্দনিকভাবে চারপাশটা সাজাতে পারি! মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যখন ২০০১ সালে ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানে পড়তে ঢাকায় আসি, তখনই রূপান্তরের আসল ভাবনাটা মাথায় আসে।

কৃষি সময়: ঢাকায় এসে কী ধরণের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা আপনাকে এই কাজে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল?

রকিবুল আমিন: ঢাকায় আসার পর চারপাশের ধূসর ইট-কাঠ আর উঁচু ভবনের ঘিঞ্জি পরিবেশ আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। শিশুরা মাটি চেনে না, পাতার গন্ধ বোঝে না—সবাই চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ। তখন সাইবার ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাগান, ফুল ও উদ্ভিদের প্রজাতি নিয়ে গবেষণা করতাম। মনে হতো, মানুষের ঘরে ও নগরের ফাঁকা জায়গায় যদি প্রকৃতির ছোঁয়া ফিরিয়ে আনা যায়, তবে শহরটা একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে। সেই তাগিদ থেকেই ব্যবসায় নামা।

কৃষি সময়: আপনার শুরুর দিনগুলো বেশ প্রতিকূল ছিল। শাহবাগে ফুল ব্যবসা দিয়ে শুরু এবং বসুন্ধরার সেই কঠিন দিনগুলোর কথা যদি পাঠকদের সংক্ষেপে বলতেন...

রকিবুল আমিন: উদ্যোক্তা হওয়ার রাস্তাটা গোলাপ বিছানো ছিল না। ২০০৪ সালের দিকে ফজরের নামাজ পড়ে শাহবাগের পাইকারি বাজারে যেতাম। ২০০৬ সালের পহেলা ফাল্গুনে ১৪,০০০ টাকা ধার করে ফুল কিনি, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব ফুল পচে নষ্ট হয়ে যায়। নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলাম। তবে ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে এক চাইনিজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বাকিতে চীনা গোলাপ নিয়ে আনাম রংস প্লাজার সামনে কোট-টাই পরে বন্ধুবান্ধব মিলে বিক্রি করে লস কাটিয়ে উঠি।
এরপর ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ‘একেশিয়া’ দোকান দিই। সেখানে ইনডোর প্লান্ট বিক্রির ভালো সাড়া পেয়েছিলাম, কিন্তু মল কর্তৃপক্ষ হুট করে ফুল-গাছের দোকান আর না রাখার সিদ্ধান্ত নিলে দোকানটা বন্ধ হয়ে যায়। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম, তবে হাল ছাড়িনি।

কৃষি সময়: সেখান থেকে ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর কীভাবে স্থাপিত হলো?

রকিবুল আমিন: বসুন্ধরার দোকান বন্ধের পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন জায়গায় ল্যান্ডস্কেপিং ও ইনডোর প্লান্ট সরবরাহের পরামর্শ দেওয়া শুরু করি। ২০১৬ সালে আর্মি স্টেডিয়ামে ল্যান্ডস্কেপিংয়ের প্রথম বড় কাজের সুযোগ পাই। থ্রিডি গ্রাফিক্স ডিজাইন বানিয়ে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে প্রেজেন্ট করার পর তারা কাজটা আমাদের দেন। সেই কাজ সফলভাবে শেষ করার পর পেছনের দেনা শোধ করতে পারি। এরপর ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ চালু করি। আজ পর্যন্ত আমরা ১০০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যান্ডস্কেপ প্রজেক্ট সফলভাবে রূপদান করেছি।

কৃষি সময়: আপনার বহুল আলোচিত ‘জিরো সয়েল’ ভাবনা ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের দর্শন সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

রকিবুল আমিন: গাছ শুধু শোভাবর্ধন করে না, এটি মানুষের মন ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেয়। আমার দর্শন হলো ‘জিরো সয়েল’—অর্থাৎ আমাদের শহরের কোথাও যেন অনাবৃত বা ফাঁকা মাটি না থাকে। ঘাস, লতা বা ছোট উদ্ভিদ দিয়ে মাটি ঢেকে দিলে তাপপ্রবাহ কমে, ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণ হয় এবং পরিবেশ শীতল থাকে। আর ল্যান্ডস্কেপিং কোনো সাধারণ গাছ বসানোর কাজ নয়; এটি একটি রাজকীয় নান্দনিক শিল্প (Royal Aesthetic Art)। ডিজাইন বেসড এই কাজে আর্কিটেক্ট, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও স্কাল্পটরদের সমন্বিত প্রয়াস লাগে।

কৃষি সময়: অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসংস্থানের দিক থেকে ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ কতটা অবদান রাখতে পেরেছে?

রকিবুল আমিন: আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে ল্যান্ডস্কেপিং বাংলাদেশে একটি বড় ইন্ডাস্ট্রি। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানে এখন প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্থায়ী কর্মসংস্থান রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন সিনিয়র ও জুনিয়র আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার ও ভাস্কর রয়েছেন। পাশাপাশি দৈনিক প্রজেক্টগুলোতে ১৫০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিকের নিয়মিত রুজিরুটি হচ্ছে। বাৎসরিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা রেভিনিউ হলেও বড় অংশই আমরা মানোন্নয়ন, টেকসই প্রযুক্তি এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক চ্যারিটি কাজে ব্যয় করি।

কৃষি সময়: ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক হর্টিকালচার ফেয়ারে সম্মাননা এবং ২০২৫ সালে জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার লাভ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

রকিবুল আমিন: নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত ১০ বছর পর পর হওয়ার সেই বিশ্ববিখ্যাত হর্টিকালচার এক্সপোতে আমাদের কাজ প্রশংসিত হয় এবং বাংলাদেশ স্টল দ্বিতীয় স্থান পায়, যা বৈশ্বিক মঞ্চে আমাদের বড় একটি অর্জন ছিল। আর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’ অর্জন আমার কাজের প্রতি দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি কোনো শেষ নয়, বরং এক নতুন পথচলার প্রেরণা।

কৃষি সময়: আপনার স্বপ্নের ‘গার্ডেন মিশন’ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শেষ প্রশ্নটি করতে চাই...

রকিবুল আমিন: আমার লক্ষ্য একটি ‘গার্ডেন মিশন’ গঠন করা, যার মাধ্যমে প্রতি ছাদ, বারান্দা, স্কুল, কলেজ ও অফিসে সবুজের স্পন্দন থাকবে। ল্যান্ডস্কেপ শিল্পে দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণের কাজের সুযোগ রয়েছে। আমরা এমন একটি বিশ্বমানের দল তৈরি করতে চাই, যারা পুরো বাংলাদেশকে একদম ছবির মতো সুন্দর করে গড়ে তুলবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাপলা ফুলে জীবিকা নির্বাহ

1

ক্যাডেটরা গভীর সমুদ্রের অকুতোভয় কাণ্ডারী হতে চলছে : মৎস্য ও

2

উল্লাপাড়ায় কাঁঠাল ব্যবসায় ধ্বস

3

হাওরে দুইবার ভুট্টা ঘাস চাষের উদ্যোগ

4

দেশে ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক আয় ৩৪ হাজার টাকার কম

5

বজ্রপাতে প্রাণ গেলো বাবা ছেলের

6

আমাদের কাছে তিনি ছিলেন ‘লিজেন্ড’

7

খালে বিষ প্রয়োগে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

8

চাঁদপুরে আখ চাষাবাদের পরিধি বাড়ছে

9

কৃষির রেটে খামারে বিদ্যুতের দাবি জোরালো হচ্ছে

10

সংকটের আশঙ্কায় বিকল্প উৎস থেকে ডিএপি সার আনতে উদ্যোগ

11

গুচ্ছের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চূড়ান্ত ভর্তির সময় বাড়ল

12

সংস্কার কমিশনে ২২ দফা সংস্কার প্রস্তাবনা দিলো মুক্ত গণমাধ্য

13

সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

14

মৎস্য গবেষণার মহাপরিচালক হলেন লতিফুর রহমান

15

মানিকগঞ্জে বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ মরিচ চাষাবাদ

16

চলনবিলের তাজা মাছ, সূর্য ওঠার সাথে সাথেই জমে ওঠে আড়ৎ

17

চড়া দামে দুধ বিক্রি করছে মিল্ক ভিটাঃ খামারি দিচ্ছেন লস

18

বাগেরহাটে অসময়ে লাউ চাষে কৃষকদের ভাগ্য বদল

19

ইলিশের ডিমের কেজি ৬ হাজার টাকা

20