কৃষি সময়
প্রকাশ : Sep 3, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শস্যবিমায় যুক্ত হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

কৃষক কার্ডকে ভিত্তি করে অঞ্চল ও ফসলভিত্তিক বিমার পরিকল্পনা


নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্রমেই বাড়ছে কৃষকের উৎপাদনঝুঁকি। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততায় ফসলহানি হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের বিনিয়োগের বড় অংশই হারিয়ে যায়। ফলে কৃষকের ঝুঁঁকি কমাতে দেশে কার্যকর শস্যবিমা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে কৃষক কার্ডকে ভিত্তি করে অঞ্চল ও ফসলভিত্তিক শস্যবিমার পাইলট কার্যক্রম শুরু এবং এ বিষয়ে একটি নির্দেশিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 


গতকাল বুধবার রাজধানীর খামারবাড়িতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে ‘ফারমার্স রিস্ক ম্যানেজমেন্ট থ্রু ক্রপ ইন্স্যুরেন্স ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ’ শীর্ষক স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন ওয়ার্কশপে বক্তারা এসব কথা বলেন। 


কর্মশালার প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সদস্য অধ্যাপক এএসএম গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে শস্যবিমা চালুর ক্ষেত্রে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। কৃষকের জন্য শস্যবিমাকে শুধু বেসরকারি বীমা কোম্পানির ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখলে হবে না; এটি কৃষক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। 


তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকনির্ভর। ভূমিখণ্ডের খণ্ডায়ন এবং কৃষিজমির মালিকানা ও চাষাবাদের ধরন পরিবর্তনের কারণে অধিকাংশ কৃষকের নিজস্ব কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। তাই কৃষিযন্ত্রের বিষয়টি শস্যবিমার আলোচনার সঙ্গে একীভূত না করে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথাও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক (ওয়েদার ইনডেক্স বেজড) শস্যবিমা চালু করা যেতে পারে।


তার মতে, সব কৃষক বা সব এলাকায় একই ধরনের বিমা প্রয়োজন হবে না। যেসব এলাকায় নির্দিষ্ট আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বেশি, প্রথম পর্যায়ে সেসব এলাকায় পাইলট কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

সরকারের কৃষক কার্ডের সঙ্গে শস্যবিমা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গোলাম হাফিজ বলেন, কৃষককে সহায়তা করার ক্ষেত্রে সরকারের একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বিমা সুবিধা দেয়া হলে সেটি কার্যকর করতে সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। 


তিনি বলেন, বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো মূলত মুনাফার জন্য ব্যবসা করে। ফলে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উপযোগী বিমা পণ্য তৈরি, তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষকের কাছে বিমা পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। 


শস্যবিমার বড় চ্যালেঞ্জ দাবি নিষ্পত্তি উল্লেখ করে পিএসসির এই সদস্য বলেন, কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও বিমার অর্থ দ্রুত পরিশোধ করা তুলনামূলক জটিল। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যাতে দ্রুত ক্ষতিপূরণ পান, সে জন্য সহজ ও স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য বড় একটি ‘এন্ডোর্সমেন্ট ফান্ড’ বা সহায়তা তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। সরকারি বরাদ্দ, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে এ তহবিল গঠন করা যেতে পারে বলে জানান তিনি। 


গোলাম হাফিজ বলেন, ‘কৃষককে সহায়তা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বেসরকারি কোম্পানি মুনাফার জন্য কাজ করবে, কিন্তু কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।’

পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়ার মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শস্যবিমা নিয়ে আলোচনা হলেও এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এখন কৃষকের স্বার্থে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, শস্যবিমা বাস্তবায়নে কৃষক কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষকের জমি, ফসলের ধরন, উৎপাদন, আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হলে বিমা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হবে। 


কৃষকের ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বরের সঙ্গে কৃষক কার্ড যুক্ত করার ফলে সরাসরি কৃষকের কাছে সেবা ও তথ্য পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সময়মতো কৃষকের মোবাইলে পাঠানো গেলে বন্যা, অতিবৃষ্টি বা অন্যান্য দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে দ্রুত শস্যবিমার সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব তথ্য কাজে আসবে। 


ড. আব্দুল মজিদ বলেন, সব ফসলের জন্য একই ধরনের বিমা ব্যবস্থা না করে অঞ্চলভিত্তিক ও ফসলভিত্তিক বীমা চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি ও জলবায়ুগত ঝুঁকি এক নয়। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি বা ঘূর্ণিঝড় বড় ঝুঁকি। তাই অঞ্চল ও ফসলের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিমা প্যাকেজ তৈরি করা হলে তা কৃষকের জন্য বেশি কার্যকর হবে। 


তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কোন অঞ্চলে কোন ফসল কত পরিমাণ উৎপাদন করা প্রয়োজন, সেই তথ্যও পাওয়া সম্ভব হবে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদনের সঙ্গে শস্যবিমাকে যুক্ত করা গেলে কৃষকের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনাও আরও পরিকল্পিত হবে।


বিশেষ করে তেলজাতীয় ফসল, ডাল ও চিনিজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে শস্যবিমাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। দক্ষিণাঞ্চলের পতিত জমিতে সূর্যমুখী এবং সিলেটের পতিত জমিতে সম্ভাবনাময় ফসল চাষের সঙ্গে বীমা সুবিধা যুক্ত করে পাইলট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি। একইভাবে চুক্তিভিত্তিক কৃষির সঙ্গেও বীমা সুবিধা যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।


শস্যবিমার পাইলটিংয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বীমা কোম্পানি, ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন ড. আব্দুল মজিদ। ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড অঞ্চল বা নির্দিষ্ট ফসলভিত্তিক শস্যবিমায় ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে বলে তিনি জানান। তার মতে, এতে কৃষকের বীমা প্রিমিয়ামের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোও এ খাতে আরও সক্রিয় হতে পারবে।


তিনি বলেন, শস্যবিমা সফল করার ক্ষেত্রে সমন্বয় ও স্থায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বীমা কোম্পানি, ব্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও কৃষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এ উদ্যোগ সফল হবে না।


কর্মশালার সভাপতি ও বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে কৃষি বীমা চালু এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ফসল বীমার নির্দেশিকা তৈরি করা হচ্ছে।


তিনি বলেন, কৃষি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিনির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা বাড়ছে। ফলে কৃষক সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। কৃষি বীমা চালু করা গেলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষক একটি নির্ভরতার ভিত্তি পাবেন এবং সারা বছর ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন। 


ড. আবদুছ ছালাম জানান, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে নির্দেশিকাটির ভ্যালিডেশন সম্পন্ন হয়েছে। অংশীজনদের মতামত ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করে নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করা হবে। পরে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। মন্ত্রণালয় আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরবর্তী উদ্যোগ নেবে।



কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান। বক্তব্য রাখেন- কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড রিস্ক মিটিগেশন, সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর পরিচালক মুহাম্মদ আমিনুল মুবিন, বিএআরসির সদস্য পরিচালক (এইআরএস) ড. মো: মোশাররফ উদ্দিন মোল্লা, বাংলাদেশ ধান গবেণষনা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো: রফিকুল ইসলাম, অধ্যাাপক ড. হুমায়ন কবির, খলিলুর রহমান এবং ঠাকুরগাওয়ের কৃষক আক্তারুল ইসলামসহ খাত সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য রাখেন।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কীটনাশক আমদানি, ব্যবহার ও বিক্রিতে নতুন নীতিমালা হচ্ছে

1

নিজ জেলায় ফিরছেন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তারা

2

ইসিফরজে প্রকল্পে ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান

3

১০ বছরে জমি কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর

4

ভোটের কালি মোছার আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে স

5

হাতিয়ায় সংরক্ষিত বন কেটে নদীতে ঘের, আটক ২২

6

ডিম-মুরগি বিক্রি : সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের পাশাপাশি ন্যূনতম

7

‘বিএআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’র জন্য প্রতিবেদন আহ্বান

8

সাতক্ষীরায় জব্দকৃত ঝিনুক সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত

9

প্রতিযোগী দেশের সাথে টিকে থাকা দায় দেশীয় স্পিনিং শিল্পের

10

কাজিপুরে ডিমের হালি ৫০ টাকা!

11

রেড চিটাগাং ক্যাটল জাত সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি

12

দুধ উৎপাদন কমায় ক্ষতির মুখে খামারিরা

13

বৃষ্টিতে কোটি টাকার সবজির চারা নষ্ট

14

জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই: সংস্কৃতিম

15

দুই লজ্জাবতী বানর উদ্ধার

16

পিরোজপুরে ব্যতিক্রমী ভাসমান পেয়ারার বাজার

17

১০ গরু থেকে ৬৫ গরুর মালিক হারুন

18

জমির বিরোধে দেড় শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ

19

লোশেডিংয়ে বিপাকে দেশের পোলট্রি খামারীরা

20