কৃষি সময় ডেস্কঃ
দেশজুড়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। এমন অবস্থায় পোলট্রি খামারের মুরগি টিকিয়ে রাখা সহ ডিম উৎপাদন ঠিক রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে খামারীদের। দীর্ঘদিন সময় জেনারেটর চালাতে খামারীদের উৎপাদন খরচ বাড়ায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দৈনিক কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সেখানকার খামারিরাও। উপজেলায় ৩১টি লেয়ার ও এক হাজারেরও বেশি ব্রয়লার মুরগির খামারি রয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ধরে রাখতে তারা জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে খরচ বেড়েছে, যা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। বর্তমানে সেখানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০ টাকায়। লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৩৮০ টাকা কেজি।
মিরসরাই উপজেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জহেদ হোসেন বাপ্পি বলেন, ‘মিরসরাই ও ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় আমার ১৫টি খামার রয়েছে। সেসব খামারে ব্রয়লার ও সোনালি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মুরগি। লোডশেডিংয়ের কারণে খামারগুলোয় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে।
যশোরের অভয়নগরে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গত শনিবার একটি পোলট্রি খামারের চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন সেটির উদ্যোক্তা ও যমজ ভাই মো. হাসান ও মো. হোসেন। এতে তাদের ৩ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। উদ্যোক্তারা জানান, তাদের খামারে আড়াই হাজারের মতো মুরগি ছিল। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময়ের মধ্যে বিক্রির উপযোগী চার শতাধিক মুরগি মারা যায়।
মো. হাসান বলেন, ‘আমরা ধারদেনা করে দুই ভাই খামারটি করেছি। বাবা-মাকে নিয়ে সারা দিন দেখাশোনা করি। মুরগি বিক্রির সময় হয়েছিল। ভেবেছিলাম বিক্রি করে সব দেনা পরিশোধ করব। কিন্তু বিদ্যুতের কারণে সব শেষ হয়ে গেল।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের প্রান্তিক খামারি আব্দুল মালেক। তার তিনটি খামারে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার মুরগি। কিন্তু বর্তমানে তার কাছে মুরগি পালন মানেই শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি খরচ সামলানোর লড়াইও।
তার ভাষায়, খামারে মুরগি আছে, উৎপাদনও হচ্ছে। কিন্তু ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকছে না। কখনোসখনো গুনতে হয় উল্টো লোকসান।
২০২০ সালের আগে দেশে প্রায় দুই লাখ পোলট্রি খামারি ছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে খামারের সংখ্যা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।
পোলট্রি খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়তে পারে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে খামারিরা টিকে থাকতে না পারলে বাজারে মুরগি ও ডিমের সরবরাহ কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) দাবি, ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু এ বৃদ্ধির সঙ্গে মুরগি ও ডিমের খামার পর্যায়ে বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে প্রান্তিক খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা টানছেন। অনেকেই তাই পেশা ছাড়ছেন।
বিপিআইএর যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন জানান, ‘দুই বছর ধরে টানা লোকসানে রয়েছেন ডিম উৎপাদনকারী পোলট্রি খামারিরা। লোডশেডিং এ খরচের তালিকা আরো বড় করেছে। আগে যে খামারির মাসে ২ হাজার টাকা জেনারেটরের পেছনে ব্যয় হতো। এখন দেখা যাচ্ছে তার ২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না। এখানে কোনোদিনই রাষ্ট্রীয় তদারকি ছিল না, এখনো নেই। কেউই এসব দেখে না। খামারিরা শুধু আর্থিকভাবেই নয়, সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ বর্তমানে ডিমের দাম বাড়লেও খামারিরা প্রতি পিস ৯ টাকায় বিক্রি করছেন বলে দাবি এ নেতার।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, গত শনিবার সন্ধ্যার পিক আওয়ারে (৭টা) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় ২ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ৫৩৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল ঢাকা জোনে। এরপর ৪৮৬ মেগাওয়াট ছিল ময়মনসিংহ জোনে। আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। একইভাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সারা দেশে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ১ হাজার ৪০৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
সার্বিক বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান জানান, ‘পোলট্রি খামারের বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক। কোনো সংকট হবে না।
কৃ/স/জয়