চট্রগ্রাম প্রতিনিধঃ সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিপাত আর বন্যায় চট্টগ্রাম, কঙ্বাজারসহ তিন পার্বত্য জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসময় ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস মুরগি মারা গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকার ।
চট্রগ্রাম পাণিসম্পদ বিভাগ এ ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরে জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার ৪৫টি উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়নে এ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ টাকা।
কঙ্বাজারে ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার ১১০ টাকা, বান্দরবানে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, রাঙামাটিতে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা এবং খাগড়াছড়িতে ৩৭ লাখ ১ হাজার টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার ১৫ উপজেলায় ১০৮টি ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২১৮টি পশুর খামার। এতে ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস-মুরগির খামারে ১৭ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, ১৬২ টন খাবারে ৯২ লাখ ২০ হাজার টাকা, ৬ হাজার ৯৬০ টন ঘাসে ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৪০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় চট্টগ্রামে ১ হাজার ১ একর, কঙ্বাজারে ৭ হাজার ৮৪০ একর, বান্দরবানে ৫১০ একর এবং রাঙামাটিতে ১ হাজার ১২৯ একর চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি খামারিরা। বিভাগজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার। এর মধ্যে গবাদিপশুর ৪ হাজার ৭৫৬টি খামারে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং হাঁস-মুরগির ৬ হাজার ২৩৫টি খামারে ১৯ কোটি ৭২ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া বন্যায় নষ্ট হয়েছে ৯১০ টন দানাদার খাবার, যার ক্ষতি ৫ কোটি ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ১৪ হাজার ২৬৫ টন খড়ের ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং ৯ হাজার ১২৯ টন ঘাসের ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা। মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা।
এই দুর্যোগকালে মারা গেছে ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি এবং ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় মারা গেছে ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া, ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগি এবং ১ হাজার ৩০০টি হাঁস। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা।
প্রাণি সম্পদ বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে আরো জানা যায়,বন্যায় পাঁচ জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গরু। ৪ হাজার ৭৫৫টি মহিষ। ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৭টি ভেড়া। ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৮২৮টি মুরগি এবং ৭০ হাজার ৩৭০টি হাঁস অসুস্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৮৯৭টি পশু এবং ৮৪ হাজার ৬৫০টি হাঁস-মুরগিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার ৬৮৯টি পশু এবং ১৯ হাজার ২৭টি হাঁস-মুরগিকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ৩টি, কঙ্বাজারের ১টি এবং বান্দরবানের ৪টি প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
গ্রামের মানুষের কাছে গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, অনেক সময় এটি পরিবারের শেষ ভরসা। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঘরের প্রয়োজন কিংবা হঠাৎ কোনো বিপদে এই পশু বিক্রি করেই অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এবারের ভয়াবহ বন্যায় সেই শেষ সম্বলও কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতি। কারও গোয়ালঘর ভেসে গেছে, কারও মারা গেছে আদরের গরু-ছাগল, আবার কারও হাঁস-মুরগির খামার মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
বন্যার পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবনে রয়ে গেছে দুর্ভোগ। বহু খামারি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তায় দিশেহারা। আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে অনেক পরিবার এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা জসিম বলেন, বন্যার পানিতে আমার গরু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। এগুলোই ছিল আমাদের পরিবারের বড় ভরসা। অনেক কষ্ট করে পশুগুলো পালন করেছিলাম। এখন সব হারিয়ে কীভাবে আবার শুরু করব, বুঝতে পারছি না।
বাঁশখালীর পুইছড়ি এলাকার বাসিন্দা লায়লা বেগম বলেন, ‘ঘরে থাকা হাঁস-মুরগিগুলো চোখের সামনে পানিতে ডুবে মারা গেছে। এগুলো বিক্রি করে সংসারের অনেক প্রয়োজন মেটাতাম। বন্যা আমাদের শুধু ঘরবাড়ি নয়, জীবিকার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপ-পরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান জানান, মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ খাতে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
কৃ/স/জয়