পটুয়াখালি প্রতিনিধিঃ পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলার নদ-নদীতে পাঙ্গাস মাছ ধরার জন্য ভয়ংকর ফাঁদ চাঁই ব্যবহার করা হচ্ছে। এই যন্ত্রে বিশেষ ধরনের খাবার দিয়ে নদী থেকে নির্বিচারে ছোট বড় পাঙ্গাস মাছ ধরা হচ্ছে। এতে এই মাছের বংশ ধ্বংস হতে চলেছে।
জানা যায়, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই নিষিদ্ধ ফাঁদ এবং এতে ব্যবহারের বিশেষ মণ্ড তৈরি করে সরবরাহ করে। শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেলের মিশ্রণে তৈরি এই মণ্ড দিয়ে প্রলুব্ধ করে নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে চাঁইগুলো পাতা হয়। খাবার লোভে চাঁই ফাঁদে পড়ছে নদীতে থাকা ছোটবড় পাঙ্গাস মাছ ও তার পোনা।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু পয়েন্ট এখন এই চক্রের কবলে। পটুয়াখালী ও ভোলায় হাদির চর, চরগুণী, মাঝের চর, পাতার চর, চর বোরহান, চর কলমি ও চর মোন্তাজসহ অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা এখন হুমকির মুখে। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া সংলগ্ন মেঘনা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীতেও চলছে একই তৎপরতা। বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনাও এর বাইরে নয়।
এই চাঁই দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের মুখে। একেকটি চাঁই তৈরিতে খরচ হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আকারে এগুলো এত বড় যে ভেতরে ২-৩ জন মানুষ অনায়াসে ঢ়ুকে পড়তে পারে।
বরিশাল পোর্ট রোডের মাছের আড়তদার জহির শিকদার বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে এই নিষিদ্ধ পোনা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘের পাঙাশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ভয়ংকর পদ্ধতি বন্ধ করা গেলে নদ-নদীতে পাঙাশের প্রাচুর্য বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। সাগর ও নদীর এই সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু নদীতে অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়; যেসব এলাকায় চাঁই তৈরি হয়, সেখানেও প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। চাঁইয়ে পাঙাশের সর্বনাশ রুখতে না পারলে আগামী দিনে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জলজ জীববৈচিত্র্য পড়বে অপূরণীয় সংকটের মুখে।
পাথরঘাটা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, ‘মৎস্য বিভাগের অভিযান এড়াতে অসাধু জেলেরা এখন হোয়াটসঅ্যাপের লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে একে অপরকে চাঁইয়ের অবস্থান জানিয়ে দেন। যা অভিযান পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এ ধরনের চাঁই পেলে সচেতন স্থানীয়রা তা জব্দ করে মৎস্য কর্মকর্তাদের খবর দেন। এরই মধ্যে একাধিক অভিযানে নিষিদ্ধ এসব চাঁই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিঙ্ বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার জানান, একেকটি চাঁইয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কেজি পাঙাশের পোনা ধরা পড়ে। পোনাগুলো এতটাই ছোট যে, মাত্র ১ কেজিতে থাকে প্রায় ৪০টি পোনা। এভাবে চলতে থাকলে মাত্র ৬ মাসেই অন্তত ২ কোটি পোনা নিধন হওয়ার আশঙ্কা আছে, যা দেশের পাঙাশ উৎপাদনকে নিয়ে ঠেকাবে তলানিতে।
সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞ ড. মো. কামরুল ইসলামের মতে, ‘মাত্র ২০ জন জেলে দিনে কয়েক মণ পোনা ধরে ফেললেই প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
কৃ/স/জয়