কৃষি সময়
প্রকাশ : Nov 1, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

দস্যু আতঙ্ক নিয়ে শুরু হচ্ছে শুঁটকি মৌসুম

বাগেরহাট সংবাদদাতাঃ 
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরে শুরু হয়েছে শুটকি তৈরি। চরাঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে মুটকির মাচা পেতেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা জেলে বহদ্দররা। তবে তাদের মনে ভর করেছে দস্যু আতঙ্ক, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি আর পাহাড়সম ঋণের বোঝা। গত মৌসুমে দস্যুেদর চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়েছেন তারা। মাছ ধরতে না পারা, বৃষ্টিতে মাছ নষ্ট হওয়া এবং চাঁদা ও মুক্তিপণ দিতে গিয়ে অনেক মহাজন বিনিয়োগের টাকাও তুলতে পারেননি। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। জায়গাজমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেছেন কেউ কেউ। তাই এবারের মৌসুমে গত বছরের মত সমস্যা তৈরি হলে তারা একেবারের পথে বসে যাবে। 

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরেন জেলেরা। তাদের জালে উঠে আসে কোরাল, লাক্ষ্যা, রূপচাঁদা, রইট্যা, ছুরি, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ। সেই মাছ দুবলার চরে রোদে শুকিয়ে শুটকি তৈরি করেন জেলে ও বহাদ্দররা। সামুদ্রিক মাছের তৈরি সেই সুস্বাদু শুঁটকি ব্যবসায়ীদের হাত বদল হয়ে চলে যাবে দেশের নানা প্রান্তে। সেখান থেকে উঠবে ভোজন রসিকদের পাতে। এভাবে প্রায় ১০০ বছর ধরে এখানে চলছে সামুদ্রিক শুঁটকির এই বাণিজ্য।

গত মৌসুমে দস্যুেদর চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়েছেন তারা। মাছ ধরতে না পারা, বৃষ্টিতে মাছ নষ্ট হওয়া এবং চাঁদা ও মুক্তিপণ দিতে গিয়ে অনেক মহাজন বিনিয়োগের টাকাও তুলতে পারেননি। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। জায়গাজমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেছেন কেউ কেউ।

গত মৌসুমের লোকসান ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েও এবার নতুন করে আবারও লাখ লাখ টাকা ঋণ ও চড়া সুদে পুঁজি সংগ্রহ করছেন অনেকে। তাদের আশা, এবারের ব্যবসা ভালো হলে শোধ করতে করবেন পুরনো ঋণ। কিন্তু সাগরে কি নিরাপদে মাছ ধরতে পারবেন? রক্ষা পাবেন কি দস্যুেদর হাত থেকে? আর বিনিয়োগের টাকা তুলে ঋণ শোধ করতে পারবেন কি না, এসব প্রশ্নই এখন ভাবিয়ে তুলছে তাদের।

দুবলার চরের শুঁটকি ব্যবসায় যুক্ত বহদ্দারদের ভাষ্য, সাধারণত পাঁচ মাসের মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিভিন্ন সমিতি ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন তারা। সেই টাকা দিয়ে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারের খরচ, জেলেদের মজুরি, জ্বালানি, খাবার, জাল এবং শুঁটকি তৈরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়। মৌসুম শেষে মাছ ও শুঁটকি বিক্রি করে আসল টাকার সঙ্গে লাভের অংশ পরিশোধ করে থাকেন।

কিন্তু গত দুই-তিন বছর ধরে দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় আয় কমছে। অন্যদিকে চাঁদা ও মুক্তিপণ দিতে গিয়ে বাড়ছে ব্যয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বৃষ্টিতে মাছ নষ্ট হওয়ার ক্ষতি। ফলে আগের ঋণ পরিশোধ না করেই নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে তাদের।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এভাবে লোকসান ও ঋণের চক্র চলতে থাকলে একসময় ছোট ও মাঝারি মহাজনদের পক্ষে শুঁটকি ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শুধু মহাজনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন তাদের ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে ও শ্রমিক।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকি পল্লীগুলো থেকে। সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা শরণখোলা রেঞ্জের আওতাধীন মাঝের কিল্লা, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালার চরসহ এই চারটি শুঁটকি পল্লীতে প্রতিবছর শীত মৌসুমে চলে সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ।

মৌসুমের পাঁচ মাস কঙ্বাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জেলে ও বহদ্দাররা এখানে এসে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে শুঁটকি তৈরি ও বাজারজাত করা পর্যন্ত নানা কাজে যুক্ত থাকেন তারা।

সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকার বাসিন্দা এবং আলোরকোলের চাকলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রউফ মেম্বর বলছিলেন, আমাদের সমিতিতে তিন শতাধিক বহদ্দারের মধ্যে ৯০ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। গতবার আমার ১২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। ১১ কাঠা জমি বিক্রি করে জেলে ও শ্রমিকদের মজুরি শোধ করেছি। এবার ব্র্যাক থেকে ১২ লাখ টাকা এবং সুদে নিয়েছি আরও ৮ লাখ, সব মিলিয়ে ঋণ নিয়েছি ২০ লাখ টাকা। তাদের সমিতির সদস্য মোবারেক সানা ২০ লাখ টাকা লোকসানে রয়েছেন। এবার ঋণ নিয়েছেন আরও ২০ লাখ। তার তথ্য মতে, গতবার লোকসানে পড়ে জাল-নৌকা বিক্রি করেও দেনা শোধ করতে না পেরে এক বিঘা জমি বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ শেখ। তার মতো ঋণের দায়ে ব্যবসা বন্ধ করতে হয়েছে চাকলা সমিতির ইউসুফ খান, নূর নবী শেখ, রফিকুল ঢালী, বাবলু ঢালী, আহম্মদ শেখসহ ১৭ জন ব্যবসায়ীকে।

দুবলা চর ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১০০ বছর ধরে দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। এখানকার শুঁটকির একটি ঐতিহ্যগত সুখ্যাতি রয়েছে দেশ-বিদেশে। এই পেশার সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এবং লাভ-লোকসানের হিসাব মাথায় নিয়েই ব্যবসায় আসেন। তবে বর্তমানে দস্যুেদর তৎপরতার কারণে এই ব্যবসা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন দস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবর শোনা যাচ্ছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনতে হয়।

তিনি বলেন, দুবলার চরের শুঁটকি উৎপাদন শুধু কয়েকজন মহাজনের ব্যবসা নয়। এর সঙ্গে একটি বড় জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে। শুঁটকি মৌসুমে সরাসরি ১০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এ ছাড়া মাছ ধরা, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, নৌযান মেরামত, শুঁটকি প্রক্রিয়া ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে আরও কয়েক হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন।

বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা মো. জাকির শেখ আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক। একই সঙ্গে তিনি একজন বহদ্দার। গত মৌসুমে দস্যুেদর তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে তাকে। সব মিলিয়ে তার লোকসান হয়েছে প্রাায় ১৫ লাখ টাকা। আগের ঋণ রয়ে গেছে আরও ১৫ লাখ। তবুও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবার নতুন করে ৪০ লাখ টাকা ঋণ ও সুদে নিয়ে শুঁটকি উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতিত নিয়েছেন তিনি। তার সমিতিতে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী সদস্য রয়েছেন। গত মৌসুমে তাদের বেশিরভাগই লোকসানে রয়েছেন।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও দুস্যুেদর কারণে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে শুঁটকি উৎপাদন ও রাজস্ব আয়ে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুবলার চরের চারটি শুঁটকি পল্লী থেকে আট কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া ও দস্যুেদর উৎপাতে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে না পারায় সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে গতবার শুঁটকি উৎপাদন হয়েচিল ৫ হাজার ৪৩১ দশমিক ৭ টন। তা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল সাত কোটি ৩৭ লাখ ২২ হাজার ৪৯৩ টাকা। চলতি মৌসুমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা। এবার জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দস্যুতা দমনে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাঁসের খামারে রহিমার ভাগ্য বদল

1

কচুয়ায় কৃষকের জমির লাউগাছ কেটেছে দুর্বৃত্তরা

2

রাজশাহী জেলায় আমন রোপণে ব্যস্ত কৃষক

3

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ডেউয়া

4

আখচাষীদের ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

5

৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ধ্বংস

6

সুপারির বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

7

চায়না ম্যাজিক জাল ধ্বংস

8

১২ বিঘা জমির পটলগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা

9

জেলের জালে ৩ কেজির ভোল পোয়া

10

খাল পুনর্খননে সেচ সংকটের অবসান

11

জলাবদ্ধতায় অনাবাদি ২শ’ একর জমি

12

বেগুনের ভাইরাসের আক্রমণে দুশ্চিন্তায় কৃষক

13

শস্যবিমায় যুক্ত হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

14

শস্যের মান পরীক্ষা ও সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চান খাদ্

15

হাঁসের খামারে সচ্ছল হচ্ছে খামারিরা

16

অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগে মাটির উর্বরতা হুমকিতে

17

বিষ দিয়ে কৃষককের ধান পুড়িয়ে দেবার অভিযোগ

18

ভোটের কালি মোছার আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে স

19

মাগুরায় কৃষকের কলাগাছ কেটেছে দৃর্বৃত্তরা

20