কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 26, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

প্রকল্প শুরুর ৩ বছর ৩ মাস পর অনুষ্ঠিত হলো সমন্বয় সভা

 বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ, মেয়াদ শেষ হতে বাকি ২০ মাস

কৃষি সময় প্রতিবেদক 
কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বাড়ানো ও গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া পার্টনার প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হতে বাকি আর মাত্র ২০ মাস। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত সাতটি সরকারি সংস্থা ও আটটি কৌশলগত অংশীদার প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রথম আন্তঃসংস্থা সমন্বয় সভা হয়েছে প্রকল্প শুরুর তিন বছর তিন মাস পর। বাস্তবায়নের ধীরগতির মধ্যে দীর্ঘ সময় সমন্বয় সভা না হওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নগত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ পরিস্থিতিতে বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা, প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) পার্টনার কর্মসূচির সম্মেলনকক্ষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বাস্তবায়নগত সমস্যা, অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি, বরাদ্দ পুনর্বণ্টন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। প্রকল্পের নতুন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সাতটি অঙ্গীভূত সংস্থার প্রকল্প পরিচালক (এপিডি), আটটি কৌশলগত অংশীদার প্রতিষ্ঠানের ফোকাল পারসন এবং সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক ও পরামর্শকেরা অংশ নেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প শুরুর পর থেকে বাস্তবায়নে যুক্ত ১৫টি সংস্থাকে নিয়ে এ ধরনের সমন্বয় সভা হয়নি। ফলে বিভিন্ন সংস্থার কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবায়নের বাধা চিহ্নিত করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি। সভায় পাওয়া তথ্য পরবর্তী ডিপিপি সংশোধনে বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পিসি ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফ।

লক্ষ্যের তুলনায় অগ্রগতি অনেক পিছিয়ে: 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ (পার্টনার) দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে নেওয়া অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচি। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ৬৪ জেলা ও ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কৃষিকে জীবিকানির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা থেকে আধুনিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষকের আয় বাড়ানো এর প্রধান লক্ষ্য। এ ছাড়া ফসলের বহুমুখীকরণ, ডিজিটাল কৃষিসেবা সম্প্রসারণ, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ফলাফলভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৫ শতাংশের বেশি অগ্রগতি অর্জনের কথা থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বাস্তবায়ন অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৮ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাকি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হলে অবশিষ্ট সময়ে বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে অসম অগ্রগতি: 

প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতিতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এর আওতায় ২৮ হাজার ৫৯৭টি কৃষক মাঠ স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০টির কার্যক্রম চলছে। উত্তম কৃষিচর্চা (জিএপি) বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত ২০ হাজার ব্যাচের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ৩০টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ২৭টি শেষ হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ১১২টি কর্মশালা আয়োজনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৩১টি।

এই চিত্রে দেখা যায়, কিছু কার্যক্রম লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছালেও কৃষকদের উত্তম কৃষিচর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজনের মতো উদ্যোগে বড় ঘাটতি রয়েছে। ফলে অবশিষ্ট সময়ে কোন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কোন সংস্থার বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন এবং কোথায় অতিরিক্ত সহায়তা দরকার—তা নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল কৃষিসেবা সম্প্রসারণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছানো, উত্তম কৃষিচর্চার সনদ প্রদান, নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মতো কার্যক্রমও রয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত কার্যক্রম সম্পন্ন করার পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে এর বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন প্রয়োজন।

প্রকল্পে সাতটি সরকারি সংস্থা ও আটটি কৌশলগত অংশীদার প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকায় প্রতিটির দায়িত্ব, কাজের ধরন ও বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। একটি সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে অন্যটির কাজের সমন্বয় না থাকলে সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে। অর্থের ঘাটতি, জনবলসংকট কিংবা কারিগরি জটিলতার মতো সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে সমাধানের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

নতুন নেতৃত্বে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ: 

প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গত ৬ অক্টোবর পরিচালকের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়। আবুল কালাম আজাদের স্থলে দায়িত্ব পান ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফ। এর আগে প্রকল্পটির প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মিজানুর রহমান। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে গত ১৫ অক্টোবর মাঠপর্যায়ের সিনিয়র মনিটরিং অফিসারদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় নিজ নিজ অঞ্চলের মাসিক কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব পরিকল্পনার ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী ও কৌশলগত অংশীদার সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং সিনিয়র মনিটরিং অফিসারদের ডিডিও ক্ষমতা প্রদানের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিরতির পর ১৫টি সংস্থাকে নিয়ে সমন্বয় সভা আয়োজন বাস্তবায়নগত সমস্যা শনাক্তের একটি পদক্ষেপ। তবে চিহ্নিত সমস্যার সমাধানে দায়িত্ব বণ্টন, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং পরবর্তী সভায় অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা কার্যকর করা না গেলে এ উদ্যোগের সুফল সীমিত থেকে যেতে পারে।

ডিপিপি সংশোধনে বরাদ্দ পুনর্বণ্টনের পরিকল্পনা:

সমন্বয় সভায় বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ডিপিপি সংশোধনে বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের কোনো কোনো খাতে বরাদ্দ কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য খাতে অর্থ পুনর্বণ্টনের বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য মাঠপর্যায়ের চাহিদার সঙ্গে প্রকল্পের পরিকল্পনার সামঞ্জস্য বাড়ানো এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা।

তবে ডিপিপি সংশোধনই বাস্তবায়নের ধীরগতি কাটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন, সময়মতো অর্থ ছাড়, প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি জরুরি। প্রতিটি সংস্থার জন্য সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন সূচক, দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ করা গেলে অগ্রগতির ঘাটতি দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের সাফল্য শুধু বরাদ্দ ব্যয় বা নির্ধারিত কার্যক্রম সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি, বাজারসংযোগ উন্নয়ন এবং কৃষিসেবায় কার্যকর পরিবর্তন আনাই এর মূল লক্ষ্য। প্রকল্প শুরুর তিন বছর তিন মাস পর প্রথম আন্তঃসংস্থা সমন্বয় সভা আয়োজন বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে এনেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ডিপিপি সংশোধন শেষে কৃষির সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প যথাযথ বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আগাছানাশক প্রয়োগের পর ধান নষ্ট

1

বাঁধের দুই কিলোমিটারজুড়ে সবজি চাষাবাদ

2

আগাম আলু চাষে ব্যস্ত কৃষকেরা

3

কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা পাড় এখন ময়লার ভাগাড়

4

শখ থেকে লাখ টাকার ব্যবসা মুনের

5

মূল্যস্ফিতি কিছুটা বেড়েছে

6

নদী দূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই

7

ডিলারশিপ বহাল ও কমিশন দ্বিগুণ করার দাবি বিএফএ’র

8

পটুয়াখালীতে ৫৪ কেজির তবল মাছ ধরা পড়েছে

9

উখিয়ায় অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্যে পরিবেশ বিপর্যয়

10

তিন বছরে পার্টনার প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ

11

আগাম আলুতে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা

12

চায়না ম্যাজিক জাল ধ্বংস

13

বৃক্ষরোপণের সাথে সেগুলোর পরিচর্যা করতে হবে: পরিবেশ প্রতিমন্ত

14

সারা দেশে সার নিয়ে কৃষকের অসন্তোষ বাড়ছে

15

শায়েস্তাগঞ্জে আমনের বাম্পার ফলনের আশা

16

পলিটানেলে তরমুজ চাষে সাফল্য

17

বিজিবির নদীতে মাছের পোনা অবমুক্ত

18

নদীর তীরে ভেসে এলো মৃত তিমি

19

পাবনায় আধুনিক সংরক্ষণাগারেও পঁচে যাচ্ছে পেঁয়াজ

20