জয়পুরহাট সংবাদদাতাঃ
জয়পুরহাটে হঠাৎ কলার দর পতনে হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষীরা। ক’দিন আগে যে কলা হাজার টাকা কাঁদি বিক্রি হয়েছে তা এখন ৩শ’ থেকে ৩শ’৫০ টাকা কাঁদিতে নেমেছে। এমন দরপরতনে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় জেলার কলা চাষীরা।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮০৭ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ৭০৫ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে। এ বছর জেলায় মোট ৩১ হাজার ৮১ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়েছে। মানিক, সাগর ও চিনিচাম্পা জাতের কলার ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেও বাজারমূল্য হঠাৎ কমে যাওয়ায় এখন বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
কৃষকদের ভাষ্য, কলা চাষে জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ প্রতি বিঘায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে এক বিঘা জমির কলা বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এতে বিঘাপ্রতি অন্তত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
চাষিদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ বাড়ার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু আড়তদার ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, অতিরিক্ত সরবরাহ ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই দাম কমার মূল কারণ।
চাষিরা বলেন, আলু ও ধানের পর এবার কলার বাজারেও ধস নামায় তাদের ওপর ঋণের চাপ আরও বাড়ছে। উৎপাদন খরচই তুলতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদের টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে। লোকসানের আশঙ্কায় কোনো কোনো কৃষক কলার গাছ কেটে জমিতে ধান চাষ শুরু করেছেন বলেও জানান তারা।
আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারের কয়েকজন কলাচাষি অভিযোগ করেন, কিছুদিন আগেও বাজারে কলার ভালো দাম ছিল। কিন্তু সরবরাহ বাড়ার পর আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ একসঙ্গে কলা কেনা কমিয়ে দেন। এতে চাষিরা গাছের কলা দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তখন কম দামে কলা কিনে নেওয়া হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বাজারে ক্রেতা কমিয়ে দিয়ে পরে পানির দামে কলা কেনার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা চাষিদের এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই। চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে কলার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দাম কমেছে। একই সঙ্গে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন মোকামে কলার চাহিদা কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, তারা চাষিদের কাছ থেকে কলা কিনে মোকামে পাঠালেও সেখানে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাদেরও লোকসান গুনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হলে পচনশীল পণ্যের দাম দ্রুত কমে যায়। কলা বেশিদিন সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব নয়। ফলে চাষিদের কাছ থেকে কেনা কলা দ্রুত বিক্রি করতে হয়। এ কারণেও বাজারদর কমে গেছে।
কৃষকদের দাবি, শুধু বাজার তদারকি নয়, কলার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন এলাকা থেকে শুরু করে আড়ত ও মোকাম পর্যন্ত বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় ভালো ফলন হলেও বাজারমূল্যের ধসের কারণে কৃষক লাভের পরিবর্তে বারবার লোকসানের বোঝা টানতে বাধ্য হবেন।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, কৃষকদের উৎপাদিত কলার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কলার দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি নজরে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃ/স/জয়