সাতক্ষীরা সংবাদদাতাঃ
সাতক্ষীরায় ওয়াপদার মূল বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসিয়ে মৎস্যঘেরে লোনাপানি নেয়া হচ্ছে। এসময় নদীর লবণাক্ত পানি আশপাশের ফসলি জমিতে ঢ়ুকে পড়ছে। এতে বাঁধের স্থায়ী সুরক্ষা যেমন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে শত শত বিঘা জমির ধানের চারা। ঘের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় ফসলের ক্ষতি সত্বেও চাষীরা প্রতিবাদ করতে পারছে না।
সাতক্ষীরার আশাশুনি কপোতাক্ষ নদের পাড়ঘেঁষে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত রোপা আমনের মাঠ। কিন্তু আশাশুনির নদীসংলগ্ন বিলে এখন সবুজের বদলে উঁকি দিচ্ছে লালচে ও তামাতে রঙের মরা চারা। কোথাও নদীর পানি চুঁইয়ে এসে জমিতে জমে আছে, কোথাও আবার ধানের পাতার গোড়া পচে গাছ ঢলে পড়েছে। ওয়াপদার মূল বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে নদীর লবণাক্ত পানি ঘেরে নেওয়ার সময় তা আশপাশের ফসলি জমিতে ঢ়ুকে ধানের এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
কপোতাক্ষ নদের তীরের মাটির বেড়িবাঁধের একটি স্থানে দেখা যায়, বাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ নেওয়ার পর সম্প্রতি সেখানে কাঁচা মাটি ফেলা হয়েছে। মাটি এখনো নরম ও কাদাটে। ওই পাইপ দিয়েই জোয়ারের সময় নদী থেকে পাশের চিংড়িঘেরে লোনাপানি তোলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাকলা গ্রাম, শুভদ্রঘাটি ও রুয়ার বিল এলাকা মিলিয়ে আশপাশের অন্তত দেড় হাজার বিঘার বেশি জমিতে প্রতিবছর ধান চাষ হয়। এলাকার বেশির ভাগ কৃষকই আমন ফসল আবাদ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ এর বিপরীতে মাত্র তিন-চারজন ঘেরমালিক প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে লোনাপানি ঢ়ুকিয়ে চিংড়ি চাষ করছেন। গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থে পুরো এলাকার সাধারণ কৃষকদের ফসল বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।
খেতের পাশে দাঁড়িয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন কৃষক নুরমান সর্দার। তিনি জানান, ছয় বিঘা জমি লিজ নিয়ে অনেক টাকা খরচ করে ধান লাগিয়েছিলেন। ঘেরের লোনাপানি ঢ়ুকে সব ধানের চারা লাল হয়ে গেছে, একটা চারাও আর বাঁচবে না। ঘেরমালিকরা লোনাপানি তুলে মাছ বেঁচে লাখ লাখ টাকা কামাবেন, আর তাদের জন্য সাধারণ কৃষকের ধান মরে সাফ হবে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
গ্রামের নারী শাকিরা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েক দিন আগে যখন বেড়িবাঁধ কেটে নদীর পানি তোলার জন্য পাইপ বসানো হচ্ছিল, তখন গ্রামের সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ঘেরমালিকরা সে বাধা কানে তোলেননি। ঘেরের লোনাপানি চুঁইয়ে এসে পাশের জমিতে ঢ়ুকছে আর ধানগাছ লাল হয়ে মরে যাচ্ছে। এই অন্যায় এখনই বন্ধ করা না গেলে এ এলাকায় ভবিষ্যতে আর ধান চাষ করাই সম্ভব হবে না।
একই ভোগান্তির কথা জানান চাকলা গ্রামের কৃষক আবদুল্লাহ ঢালী। গত বছরও এই বিলে আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতবার এই জমি থেকে পরিবার নিয়ে চলার মতো ধান পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এবার পাশের ঘেরের লোনাপানি ঢ়ুকে তার তিন বিঘাসহ আশপাশের অনেকের জমির চারা একবারে নষ্ট হয়ে গেছে। পাইপ দিয়ে ঘেরে লোনাপানি তোলা যতক্ষণ বন্ধ না হবে, কৃষকদের এই ক্ষতি হতেই থাকবে।
বাঁধ রক্ষা ও নিজেদের একমাত্র সম্বল ফসল বাঁচাতে গত ২৩ আগস্ট চাকলা গ্রামের পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ১০-১২ জনের একদল চাকলা গ্রামের তেলিখালী বিল এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বন্যানিয়ন্ত্রণ মূল বেড়িবাঁধ কেটে বেআইনিভাবে পাইপ বসিয়েছেন। অবিলম্বে এসব পাইপ অপসারণ না করা হলে শত শত বিঘা জমির ফসল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামবাসীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পাউবোর টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করেছে এবং ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। মূল বেড়িবাঁধ ফুটো করে এভাবে লোনাপানি তোলা সম্পূর্ণ অবৈধ।
তিনি আরও জানান, বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করার অপরাধে অভিযুক্ত ঘেরমালিক আসলাম হোসেনের বিরুদ্ধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা ও মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বাঁধের ভেতর দিয়ে নেওয়া এসব পাইপ উচ্ছেদে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।
কৃ/স/জয়