টি এম কামাল,কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) :
সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে অন্যরকম হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সকাল ৭টা বাজতেই নাটুয়ারপাড়া হাট-বাজারে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে কাঁচি, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে ও বসে আছেন। তাদের সবার লক্ষ্য একটাইÑআজকের দিনের জন্য একটি কাজ জোটানো।
এটি কোনো পশুর হাট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজার। এটি শ্রমের হাট। এখানে প্রতিদিন ও সাপ্তাহিক নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে চলে প্রায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন, এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায় এটি ‘শ্রমিকের হাট’।
একই চিত্র দেখা যায় দুর্গম চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া হাট-বাজারে। ভোর থেকে সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, না মিললে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়। রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার কৃষকরা বলেন, সাপ্তাহিক শনিবার ও বুধবার হাটের দিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের পরে বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে কৃষিকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও বাড়ে। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী। কাজ না পেলে সংসারে সংকট নেমে আসার কথা জানান শ্রমিকদের অনেকেই। তারা জানান, দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল তারা। এক দিন কাজ না হলে সেদিনের বাজারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে হয়।
শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নাই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়। আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে বাড়ির মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়। শ্রমিক নিতে আসা ঘোড়াগাছা গ্ৰামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে। শাহীন মিয়া বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।
শ্রমিকদের কারও বয়স ২০, কারও ৬০ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে। এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।
সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন হাটটিও ফাঁকা হতে শুরু করে। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।
কাজিপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া হাট ইজারাদার আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, বহু বছর ধরে এ হাটে শ্রমিক বিক্রি হয়ে আসছে।
কৃ/স/জয়