কুস্টিয়া সংবাদদাতাঃ
কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ির আঙ্গিনায় কেঁচো সার তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন শতাধিক নারী। তারা এই সার নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়ি থেকেই বিক্রি করে এখন ভাল টাকা আয় করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। কৃষি বিভাগ থেকে সার তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা আজ এভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
কুষ্টিয়া জেলা সদরের বিত্তিপাড়া গ্রাম। প্রত্যন্ত এই গ্রামের নারীরা কয়েক বছর আগেও বাড়িতে গৃহস্থালির কাজেই আবদ্ধ ছিলেন। স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে ভার্মি কম্পোস্ট কেঁচো সার তৈরি করছেন। বাড়ির আঙ্গিনায় সিমেন্টের চাকের ভিতর গোবর,বিভিন্ন উপকরণ যোগকরে কেঁচো দিয়ে এই সার তৈরি করছেন। নিজেদের খামারের গোবর সহ বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করে বাড়তি সার উৎপাদন করছেন। এই উৎপাদিত সার তারা নিজেদের সবজি বাগান সহ জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করছেন। অনেক গৃহিনী অনলাইনে বাড়িতে বসেই এই সার বিক্রি করছেন। অনেকের বাড়ি থেকেই পাইকার এবং স্থানীয় কৃষকরা কিনে নিচ্ছেন। গৃহস্থঅলির কাজের ফাঁকে এই কাজ করে তারা এখন ভাল টাকা আয় করছেন। যা দিয়ে নিজের সংসারে বাড়তি যোগান দেয়া সহ সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। অনেকেই অর্থ সঞ্চয় করছেন।
অথচ এই নারীরাই কয়েক বছর আগে গৃহস্থালির কাজের বাইরে কিছুই করতে না। ২০২১ সালের দিকে কৃষি বিভাগের একটি প্রশিক্ষণ এখন তাদের জীবন বদলে দিয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে আয় করতে পারায় সংসারে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। সবাই সন্মানের চোখে দেখছে।
গৃহবধুরা সিমেন্টের তৈরি প্রতিটি চাক কেনেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। সেখানে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট, কলাগাছের বাকল ফেলেন। শুরুর দিকে কৃষি অফিস থেকে সংগ্রহ করা কেঁচো দেন। এখন অবশ্য নিজেদের সংগ্রহেই কেঁচো আছে। এরপর চাকটি ঢেকে রাখা হয় ২০ থেকে ২৫ দিন। মাঝেমাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। এভাবে জৈব সার তৈরি হয়। এরপর চালুনিতে চেলে ছোট ছোট প্যাকেট বা বস্তায় ভরে বিক্রি করেন। প্রতি মাসে এভাবে নারীরা বিপুল পরিমাণ জৈব সার উৎপাদন করছেন। প্রতি কেজি সার বিক্রি হয় ১৫ টাকায়। নিজেরা ব্যবহার করেন। অবশিষ্ট সার বিক্রি করেন। বিভিন্ন এলাকার কৃষক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে এসব নারীদের বাড়ি এসে এই কেঁচো সার কিনে নিয়ে যান।
কেঁচো সার তৈরিতে এই গ্রামের সবচেয়ে সফলদের মধ্যে জাহানারা খাতুন একজন। তিনি জানান,কেঁচো সারেই আমাদের জীবন বদলে গেছে। কয়েক বছর আগেও বাড়িতে ছাপড়া ছিল। সেখানে দালান তুলেছি। গরু-ছাগল পালছি। সামান্য জমি আছে। সেখানে যা ধান হয়, তা দিয়ে আমাদের চলে যায়। তা ছাড়া বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ফলাই। সরকারি নানা সহযোগিতা পেয়ে এতদূর এসেছি। আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেক নারী এখন জৈব সার তৈরি করছেন। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।
মনিরা খাাতুন নামে আরেক সার তৈরির উদ্যোক্তা জানান, তাদের গ্রামের বাসিন্দারা আগের তুলনায় এখন কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। তারা জৈব সার ব্যবহার করে বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ নানা সবজি ফলাচ্ছেন। ধান, ভুট্টা ও শসা ক্ষেতেও জৈব সার ব্যবহার করছেন।
রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, ‘বিত্তিপাড়া গ্রামে সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়। জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন নারীরা। প্রথমত নিজেদের ফসলের জমিতে এই সার ব্যবহার করা হয়। বাড়তি সার বিক্রি করে কিছু টাকা আয় হয়। সংসারের কাজে লাগে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন জানান, এই গ্রামে একজন থেকে শুরু করে এখন শতাধিক নারী জৈব সার উৎপাদন করছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় সাফাল্য। তাদের প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। প্রায় প্রতি বাড়িতে বস্তায় সবজি উৎপাদনের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। নারীরা যাতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারেন এবং এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন, সে জন্য আমাদের এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
কৃ/স/জয়