কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 27, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

নেত্রকোনার শীতল পাটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে

নেত্রকোনা সংবাদদাতাঃ 
নেত্রকোনার শীতল পাটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।  কালের বিবর্তনে, প্লাস্টিকের সস্তা পণ্যের দাপটে এবং সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হাজার বছরের পুরোনো এই শিল্প এখন হারিয়ে যাবার কারন। 

জানা যায়, গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে শীতল পাটির জুড়ি মেলা ভার। এ দেশের লোকশিল্পের ইতিহাসে যে কয়টি নাম গর্বের সাথে উচ্চা রিত হয় তার মধ্যে নেত্রকোনার শীতল পাটি অন্যতম।  এই পাটি তৈরির মূল উপাদান হলো স্থানীয়ভাবে তার নাম মুক্তা (মুর্তা) গাছ বা পাটিবেত। দেখতে অনেকটা সরু বাঁশঝাড়ের মতো। এই গাছগুলো সাধারণত নদী-খাল বা জলাধারের আর্দ্র মাটিতে আপনা আপনি বা ঝোপঝাড়ের মতো জন্মায়। নদী বা খালের ধারে জন্ম নেওয়া মুক্তা গাছ কেটে তা সেদ্ধ করে নিপুণ হাতে ছিলে তৈরি করা হয় মিহি বেত। এরপর কারিগরদের আঙুলের ছোঁয়ায় হাজারো সুতোর মতো বেত মিলে তৈরি হয় একেকটি মনোমুগ্ধকর শীতল পাটি।

নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেতুলিয়া ইউনিয়নের কেন্দুয়া, জৈনপুর, ভাটাপাড়া, হাতনী এবং পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াগাও গ্রামে এই পাটি তৈরী হয়ে থাকে। এখানকার প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩শত পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত। গ্রামীণ জনপদে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসছে এই হস্তশিল্পের চর্চা। কিন্তু আধুনিক যুগে কালের পক্রিমায় তা হারিয়ে যেতে বসেছে।

একটি শীতল পাটির মূল্য তিন থেকে চার হাজার টাকা। মূল্য বেশি থাকায় শীতল পাটি বিক্রির পরিমাণ একেবারেই কম। তাই কারিগররা অর্ডার ছাড়া তৈরী করেননা। তবে যে পাটি সব সময় বিক্রি করা যায়, সেই পাটি তারা তৈরী করে। আর সেটির নাম হচ্ছে জামদানি পাটি। এই পাটির মূল্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শত টাকা। এই পাটিই তারা সব সময় তৈরী করে থাকে।  

ভাটপাড়া গ্রামের গোপাল দাস, নরেশ দাশ, দীজেন দাসসহ আরো অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, দিনরাত খেটে একটি পাটি বুনার পর যে মজুরি পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে বহু কারিগর তাঁদের বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে দিনমজুরি বা অন্য কাজে যোগ দিচ্ছেন। ফলে নতুন প্রজন্মও এই শিল্প শিখতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এগুলো ঠিকিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যেগ নিতে হবে। তা না হলে এই হস্তশিল্প একদিন বিলীন হয়ে যাবে।

কেন্দ্রুয়া গ্রামের শুনকা বনিক, প্রমিলা করসহ আরো নারী বলেন, পাটির কাজ শুধুমাত্র আমরা নারীরাই করে থাকি। আগে নারী-পুরুষ সবাই মিলে করেছি। এই হস্তশিল্প তৈরী করতে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাঁচামালের সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ জমি ও জলাশয়ের অভাবে মুক্তা (মুর্তা) গাছের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে বেতের অভাবে কাজ করা যায়না। বর্তমানে বাজারে সস্তা দামের প্লাস্টিক ও চায়না ম্যাটের বিস্তার ঘটায় প্রাকৃতিক শীতল পাটির চাহিদা একেবারেই কমে গেছে। তাই আমাদেরও কাজ তেমন নেই। একটি জামদানি পাটি বুনতে ৪ থেকে ৫শত টাকা খরচ হয়। যাদের বাড়িতে মুক্তা গাছ আছে তাদের লাভের পরিমাণ বেশি।

কেন্দুয়া গ্রামের প্রশান্ত কর বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার আমলের আগে থেকেই এই পাটির বোনার কাজ করে আসছি। আগে আমরা এই পাটি তৈরী করে অনেক লাভবান হয়েছি। পুরো গ্রামের প্রতিটি পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু এখনো আছে যা নামে মাত্র। শুধুমাত্র ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা করি। বাপ-দাদা এই কাজ করে আসছে, তাই আমরাও করি।

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন বলেন, নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পল্লী জীবিকায়ন সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন সময় তাদের ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। এই পেশার তাদের কর্মমুখী করে তোলার জন্য ঋণ দেয়া হচ্ছে। এই শিল্পকে ধরে রাখার জন্য তাদেরকে বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নতুনদের আগ্রহ তৈরী করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিপুল পরিমাণ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ

1

মাছ না পাওয়ায় কষ্টে চলছে জেলেদের জীবন

2

জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের হাজারো পরিবারে আয় বাড়িয়েছে এফএও

3

মুখী কচুতে কৃষকের মুখে হাসি

4

জলাবদ্ধতায় ২শ বিঘা জমিতে চাষাবাদ বন্ধ

5

হিমাগারের আলুতে ১৩৩ কোটি লোকসানের শঙ্কা

6

মাছ-কাঁকড়া ধরতে যেতে পারছেনা জেলেরা

7

খালের নেটপাটা অপসরন করলো স্থানীয়রা

8

দেশে আগের চেয়ে বেশি সারের মজুদ আছে-কৃষিমন্ত্রী

9

গোখাদ্যের চড়া দামে দিশেহারা খামারি

10

ফরিদপুরে খামারিদের মাঝে মিল্কিং মেশিন বিতরণ

11

মানিকগঞ্জে বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ মরিচ চাষাবাদ

12

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

13

ফরিদপুরে লোকসানের মুখে মরিচ চাষিরা

14

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন

15

বৃষ্টি না থাকায় ফসল বাঁচাতে সেচেই ভরসা

16

লক্ষীপুরে নির্মাণ হবে বাফার গুদাম

17

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৯ টন জিরা জব্দ

18

পাট চাষে ফিরছে সুদিন

19

সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্কে কমছে মধু সংগ্রহ

20