যশোর প্রতিনিধিঃ যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার বাসুদেবপুর এখন দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে নার্সারি গ্রাম হিসাবে। এ গ্রামে রয়েছে কয়েক শতাধিক নার্সারি। আর এর সাথে যুক্ত গ্রামটি শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ। এটিই এখন গ্রামের আয়ের একমাত্র পথ। এখানকার উৎপাদিত হরেক রকম গাছের চারা যাচ্ছে সারা দেশে। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করে এখন সচ্ছল স্বাভলম্ভী চাষীরা।
জানা যায়, নার্সারি গ্রামে যাত্রা শুরু আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দি আগে। সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে এখানে নার্সারি ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে তিনি পতিত জমিতে মসলা ও লিচুর চারা চাষ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তার দেখানো পথ ধরেই পুরো গ্রামে এ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে।
যশোর সদর থেকে বাসুদেবপুরের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। গ্রামের পিচঢালা পথ ধরে এগোলেই চোখে পড়বে চমৎকার এক দৃশ্য। এখানকার কোনো জমিই অনাবাদি পড়ে নেই। রাস্তার দুইপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু ফুল, ফল, মসলা ও বনজ গাছের চারার মেলা। প্রতিটি বাড়ির সামনে শোভা পাচ্ছে নার্সারির নামসংবলিত সাইনবোর্ড। গ্রামটিতে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। কেউ নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ ঝাঁঝরি দিয়ে পানি দিচ্ছেন। আবার কেউ চারা তুলে দিচ্ছেন ভ্যান, নসিমন, ট্রাক বা পিকআপে।
নার্সারি মালিকদের দাবি, সারা দেশের মধ্যে এ গ্রামেই সবচেয়ে বেশি লিচুর চারা উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে দিনাজপুরের চাষীদের কাছে এ চারার কদর অনেক বেশি। প্রতি বর্ষা মৌসুমে দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখান থেকে চারা পাঠানো হয়। একেক মৌসুমে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে। শুধু বর্ষা ঋতুতেই ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার লিচুর চারা বিক্রি হয় এ গ্রামে।
নার্সারি মালিক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তাদের নার্সারিটি খুলনা বিভাগের প্রথম নার্সারি। ২২ বিঘা জমিতে ঐতিহ্যবাহী ‘পুরাতন নার্সারি’ পরিচালনা করছেন। সেখানে এখন লক্ষাধিক চারা রয়েছে।
আরেক সফল উদ্যোক্তা মোশাররফ গাজী। ৩৭ বছর আগে তিনি অন্যের জমিতে শ্রম দিতেন। এরপর পাঁচ শতক জমি ইজারা নিয়ে চারা তৈরি শুরু করেন। আজ তিনি ১৮ বিঘা জমির মালিক। চারা বিক্রির আয় থেকে তিনি বাজারে একটি দোতলা মসজিদ ও মাদরাসা তৈরি করে দিয়েছেন। তার নার্সারিতে দেশি বিদেশী বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা পাওয়া যায়।
নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘গ্রামে ছোট নার্সারিগুলোও বছরে দেড় থেকে ২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করে। বড়গুলোর বিক্রির পরিমাণ আরো অনেক বেশি। পুরো গ্রামে প্রতি বছর চারা বিক্রি থেকে ১৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক লেনদেন হয়।’ তার মতে, দেশের মানুষ যে লিচু খায়, তার সিংহভাগ চারা এ বাসুদেবপুর থেকেই যায়।
এখানকার বেশিরভাগ নার্সারি মালিক এই পেশায় এসে এখন সচ্ছল। বছরে এ কাজের মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। নিজেদের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি সবুজ বাংলাদেশ গড়তে তারা রেখে চলেছেন বিরাট অবদান।
কৃ/স/জয়