কৃষি সময়
প্রকাশ : Jul 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সিউইড চাষে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার আগার আমদানি কমানো সম্ভব

সমুদ্রিক শৈবাল বা সিউইডকে বিশ্বের অনেক দেশ এখন ‘সুপারফুড’ হিসেবে বিবেচনা করছে। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, টিস্যু কালচার, জৈবসারসহ বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও এক দশকের গবেষণায় সিউইড চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। ইতোমধ্যে দুটি জাত অবমুক্ত হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে আগার উৎপাদনের প্রযুক্তি এবং কক্সবাজার উপকূলে প্রায় তিন হাজার খামারি বাণিজ্যিকভাবে সিউইড চাষ করছেন। সিউইডের পুষ্টিগুণ, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কৃষি সময়-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সদস্য পরিচালক (প্রাণিসম্পদ) ও ‘উপকূলীয় এলাকায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ প্রযুক্তির যাচাই ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

প্রশ্ন: সিউইডকে কেন ‘সুপারফুড’ বলা হয়?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: সিউইড বা সামুদ্রিক শৈবালকে সুপারফুড বলা হয়, কারণ এতে ভিটামিন, মিনারেল, আয়োডিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসহ অসংখ্য উপকারী পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সিউইড খেয়ে আসছে। এর ফলে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে, বার্ধক্য তুলনামূলক ধীরে আসে এবং শারীরিক সক্ষমতাও বেশি থাকে। আমাদের দেশেও পুষ্টিহীনতা দূর করতে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সিউইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে সিউইড নিয়ে গবেষণার বর্তমান অবস্থান কোথায়?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) ২০১৬ সাল থেকে যৌথভাবে সিউইড নিয়ে গবেষণা করছে। দেশে প্রায় ২০০ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত ১২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় বীজ বোর্ড থেকে দুটি জাত অবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এগুলো হলো বারি সিউইড-১ (এৎধপরষধৎরধ ঃবহঁরংঃরঢ়রঃধঃধ) এবং বারি সিউইড-২ (টষাধ ষধপঃঁপধ)। এর মধ্যে বারি সিউইড-১ একটি স্থানীয় জাত এবং বারি সিউইড-২ জাপান থেকে সংগ্রহ করা হলেও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে বীজ উৎপাদন ও সমুদ্রে চাষ উপযোগী করা হয়েছে।

প্রশ্ন: বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সিউইড চাষ কতটা বিস্তৃত হয়েছে?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: কক্সবাজারের নুনিয়াছড়াসহ আশপাশের এলাকায় আমরা প্রায় ৫০০ খামারিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার খামারি সিউইড চাষ করছেন। দুটি পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে। একটি হলো জোয়ার-ভাটার সময় অগভীর পানিতে রশি পদ্ধতিতে চাষ, অন্যটি অপেক্ষাকৃত গভীর পানিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ। রশির নির্দিষ্ট দূরত্বে বীজ লাগিয়ে সমুদ্রে রেখে দিলে ১৫ দিনের মধ্যেই শৈবাল বেড়ে ওঠে এবং পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা যায়।

প্রশ্ন: এই চাষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতটা?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: সিউইড চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উৎপাদন ব্যয় খুবই কম। কোনো রাসায়নিক সার, কীটনাশক বা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা সিউইড প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। শুকানোর পর একই সিউইডের দাম বেড়ে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা হয়। ফলে খুব কম বিনিয়োগে খামারিরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। অনেকেই আগের পেশা ছেড়ে এখন সিউইড চাষে যুক্ত হয়েছেন। এই আয় দিয়ে তারা পরিবারের ব্যয় নির্বাহ, সন্তানদের লেখাপড়া এবং জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন।

প্রশ্ন: উৎপাদিত সিউইড কোথায় ব্যবহার হচ্ছে?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: উৎপাদিত সিউইড শুকিয়ে ঢাকা ও কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয় মানুষও এখন এটি কিনে খাচ্ছেন। সীমিত পরিসরে বিদেশেও রপ্তানি শুরু হয়েছে। তবে আরও বেশি মানুষকে সিউইড খাওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়লে বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

প্রশ্ন: আগার নিয়ে এত গুরুত্ব কেন?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: আমাদের গবেষণার অন্যতম বড় সাফল্য হলো সিউইড থেকে আগার উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। আগার একটি উচ্চমূল্যের পাউডার, যা মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে ব্যাকটেরিয়া কালচার, টিস্যু কালচার, আইসক্রিম, পুডিং, বেকারি, খাদ্যশিল্প, প্রসাধনী এবং ওষুধশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আগার আমদানি করা হয়। যদি দেশেই বৃহৎ পরিসরে সিউইড চাষ ও আগার উৎপাদন করা যায়, তাহলে এই আমদানির বড় অংশ কমানো সম্ভব হবে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম দামে কাঁচামাল পাবে।

প্রশ্ন: প্রকল্পের অন্যান্য অর্জন কী?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: আমরা শুধু দুটি জাত অবমুক্ত করিনি, কক্সবাজারের তারাবুনিয়ারছড়ায় একটি আধুনিক সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণাগারও স্থাপন করেছি। সেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে গবেষণা চলছে। সিউইড ব্যবহার করে ১০টির বেশি উন্নতমানের খাদ্য রেসিপি তৈরি করা হয়েছে, যা কক্সবাজারের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও উদ্যোক্তারা ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি সিউইড থেকে তরল জৈবসার ও কম্পোস্ট সার তৈরির গবেষণাও চলছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের জন্য সিউইডের ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: বাংলাদেশের সামনে সিউইডের অত্যন্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। আমাদের দীর্ঘ উপকূল, অনুকূল জলবায়ু এবং কম উৎপাদন ব্যয় এই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করলে সিউইড দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। আমি বিশ্বাস করি, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সামুদ্রিক শৈবাল বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

কৃ/স/জয়

 


 


 


 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কলাপাড়ায় ধান কেনা সিন্ডিকেটের কবলে হাজারো কৃষক

1

আরোও বন্যার শঙ্কাঃ বাড়বে পানি

2

সেন্টমার্টিন মাস্টার প্ল্যানে ট্যুরিজমের আগে সংরক্ষণকে গুরুত

3

মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ডক্টর জেড করিমকে সংবর্ধনা

4

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২,৭২৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

5

রাবির বৃত্তি তহবিলে ভূমিমন্ত্রীর ১০ লাখ টাকার অনুদান

6

এক কাঁঠালের দাম ১০ হাজার টাকা

7

চিরচেনা সাদা ভাতের পাতে উঠবে ব্ল্যাক রাইস

8

রফতানিমুখী বাণিজ্যিক কৃষি : উন্নয়ন এবং চ্যালেঞ্জ

9

ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই উৎপাদন হচ্ছে রোগমুক্ত চারা

10

মিরপুর চিড়িয়াখানা খাঁচা থেকে বের হওয়া সিংহ খাঁচায় ফিরল

11

বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভা

12

মাছ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে দুই অভয়াশ্রম

13

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট

14

শস্য ভান্ডারে যুক্ত হলো দু’টি হাইব্রিডসহ ছয় নতুন ধানের জাত

15

আমাদের কাছে তিনি ছিলেন ‘লিজেন্ড’

16

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

17

চট্রগ্রামে ডুবে গেছে ১০ হাজার মৎস্যঘের

18

শিল্পবর্জ্যে বিপন্ন গাজিখালি নদীর পরিবেশ

19

পাহাড়ে হাতির অভয়াশ্রম

20