লক্ষীপুর সংবাদদাতাঃ
লক্ষীপুরে সুপারি চাষাবাদ ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন চাষীরা। এখনকার প্রায় প্রতিটি বাড়ি আবং আঙিনায় সুপারি চাষাবাদ হচ্ছে। যা বিক্রি করে ভাল টাকা আয় করছেন চাষীরা। জেলায় উৎপাদিত সুপারি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে সারা দেশে। এই সুপারি জেলার অর্থনীতিকে করেছে শক্তিশালী।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর লক্ষীপুরে ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল। বর্তমানে বাগানের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর। গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৪২ হাজার ২৭০ টন সুপারি। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ টন।
লক্ষীপুরে অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম সুপারি। বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে সুপারি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি মৌসুমে সুপারির ফলন গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। এতে চাষিদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে।
এখানকার উৎপাদিত সুপারি জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সুপারির উৎপাদন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে উন্নত জাত উদ্ভাবন, গবেষণা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। তাদের মতে, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে লক্ষীপুরের অর্থনীতিতে সুপারি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জেলার এই উৎপাদিত সুপারি ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র গড়ে উঠেছে একাধিক বাজার ও মোকাম। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সুপারি বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়পুর উপজেলার হায়দারগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ। এ ছাড়া লক্ষীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসিন এবং রামগঞ্জের সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও সুপারি কেনাবেচা হয়। মৌসুমে এসব বাজারে বাগানমালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুপারি নিয়ে আসেন। পরে পাইকারি ব্যবসায়ীরা তা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।
লক্ষীপুরে সুপারি সাধারণত পাকা, ভেজানো ও শুকনা এই তিনভাবে বিক্রি হয়। উৎপাদিত সুপারির বড় একটি অংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করেন ব্যবসায়ীরা। নদী-নালা, খাল-ডোবা, পুকুর ও সিমেন্ট-ইটের তৈরি পাকা চৌবাচ্চায় এসব সুপারি রাখা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় কিংবা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়।
লক্ষীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকার সুপারি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে সুপারি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রামের ছোট হাট থেকে সুপারি কিনে এনে এ বাজারে বিক্রি করেন। বাজারে আসা অধিকাংশ পাইকার জেলার বাইরের। সপ্তাহে দুই দিন এ বাজারে বেচাকেনা হয়। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে শুধু এ বাজারেই এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
রায়পুরের সোনাপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল মিয়া বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বাগানের সুপারি পাকে। এ সময় ভেজানো সুপারির মজুতদারেরা বাজার থেকে সুপারি কেনেন। কেনা সুপারির বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। কৃষকদের বিক্রি শেষ হলে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে বাজারে সুপারির দাম বাড়তে থাকে। তখন ভেজানো সুপারি বেশি বিক্রি হয়।
দুই যুগ ধরে সুপারির ব্যবসা করছেন রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, সুপারির মৌসুমে কেনাবেচা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যস্ততাও বাড়ে। স্থানীয় হাটবাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়। প্রতিবছর তার মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয় বলে দাবি করেন তিনি|
তেমুহনী বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) সুপারি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সুপারি কিনতে আসেন। তাদের মাধ্যমে এসব সুপারি বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সুপারি এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় অবলম্বন। কিন্তু তাদের বাগানের সুপারি চুরি ইদানিং বেড়েচে। এই চুরি বন্ধ না হলে তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন। কৃষকদের দাবি রাতে পুলিশি টহল বৃদ্ধি, গ্রাম পুলিশ সক্রিয় করা এবং চোরচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি আশা করছেন, যাতে আর কেউ এই চক্রের শিকার না হয়।
লক্ষীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জহির আহমেদ বলেন, লক্ষীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। একবার সুপারির চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হিসেবে সুপারি চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। লক্ষীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এরপরই রয়েছে সদর উপজেলা। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারি মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃ/স/জয়