কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 12, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কলা চাষে রংপুরের নতুন সম্ভাবনা

রংপুর সংবাদদাতাঃ 
রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে কলা চাষাবাদ। বিস্তীর্ণ এলাকায় সাগর, মালভোগ, চিনি চম্পা ও মেহের সাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক চাষ হচ্ছে। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় চাষীরা কলা চাষে ঝুঁকছে। তবে বাজার ব্যবস্থায় সিন্ডিকেটের কারনে কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না চাষীরা। 

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ৪ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছিলো। এখান থেকে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩৫৭ মেট্রিকটন কলা। ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল উৎপাদন হয় আম। যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৮৫ হেক্টর জমির বিপরীতে ৭০ হাজার ৭০ টন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই পাঁচ জেলায় ৪ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন। এরমধ্যে রংপুর জেলায় ২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমির বিপরীতে উৎপাদন হয় ৮৮ হাজার ১৪০ টন, গাইবান্ধায় ৭৪৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১১ হাজার ৯৩ টন, কুড়িগ্রামে ৪৯৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১৭ হাজার ৮৭০ টন, লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর জমির বিপরীতে ৭ হাজার ৪৭৭ টন এবং নীলফামারী জেলায় ৩৯৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৩৩৬ টন। ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল আম ৫ হাজার ৮০৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ৫৬৪ টন।

চাষিরা বলছেন, একবার কলাগাছ রোপণ করলে সেখান থেকে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। অল্প পুঁজিতে ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও এখন কলা চাষে ঝুঁকছেন। তবে বিপত্তি ঘটছে ফসল কাটার পর। কলা একটি দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় খেত থেকে তোলার পর দ্রুত বাজারে বিক্রি করতে না পারলে তা পচে যায়।

২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রংপুর জেলায় ২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ৮৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন। গাইবান্ধা জেলায় ১ হাজার ১৮৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৮৭০ টন। কুড়িগ্রাম জেলায় ৪০৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৬০ টন। লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৭ হাজার ২০০ টন এবং নীলফামারী জেলায় ৩২৩ হেক্টর জমিতে কলা উৎপাদন হয় ১২ হজার ১৫৭ টন। ওই পাঁচ জেলায় মোট ৪ হাজার ৩৫৬ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ২২৭ মেট্রিক টন। ওই বছরে ৫ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির বিপরীতে আম উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার ৭৭৪ টন।

রংপুর অঞ্চলে কলার বাম্পার ফলন হলেও এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কলার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে কলা থেকে চিপস, জুস বা গুঁড়ো তৈরির মতো কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, দিনাজপুরের, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলাতেও প্রতিবছর তিন হাজার থেকে সাড়ে হাজার হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। এসব কলা দিনাজপুরের দশমাইল, রংপুর- ঢাকা মহাসড়কের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জের ফাঁসিতলা হাটে প্রতিদিনই কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।

রংপুরের বিভিন্ন গ্রামে কৃষি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে কিংবা বাড়ির পাশে খালি জায়গাতেও এখন দেখা মেলে কলাগাছ। কোথাও আবার কলাগাছের বড় বড় বাগান। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে কলা চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। 

স্থানীয় কলা চাষিদের মতে, এই অঞ্চল কলা চাষের উপযোগী। এখানকার কলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। তবে সঠিক সংরক্ষণাগার ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে, যা এই সম্ভাবনাময় খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অঞ্চলের কলা।

এ ছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও প্যাকেজিংয়ের অভাবের কারণে খেত থেকে কলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারে পাঠানোর সময় একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে চাষিদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কলা কিনে নেয়। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনি করেও কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের তকেয়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, কলা চাষ করে আমাদের ভাগ্য বদলানোর সুযোগ আছে। আবার কিছু কারণে সমস্যাও আছে। যখন একসাথে অনেক কলা কাটি, তখন কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। একটু দেরি হলেই কলা নষ্ট হতে শুরু করে। এতে আশানুরূপ লাভ হয় না। তবে কলা চাষে অল্প খরচে ভালো আয় রোজগার করা সম্ভব বলে মনে করেন এই কৃষক। 

স্থানীয় কলাচাষী আনোয়ার হোসেন জানান,একসময় অন্যের জমিতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে আয় রোজগার করলেও এখন কলার বাগান করে ভাগ্য বদলেছে তার। তার মতো হাজারো কৃষক এখন কলা চাষ করে স্বাবলম্বী। তবে কলা চাষে ভাগ্য বদলানোর সুযোগ থাকলেও সংরক্ষণে বিশেষায়িত হিমাগার না থাকা ও ফড়িয়া সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। তারপরও অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে রংপুর অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। 

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার পাইকানটারী গ্রামের কলা চাষি সাজু মিয়া বলেন, এক বিঘা (২৭ শতাংশ) জমিতে উৎপাদন খরচ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ওই পরিমাণ জমিতে ৩০০টি চারা লাগানো যায়। কলা ভালো হলে এক গাদি কলা ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে এক বিঘা জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।
 রোজার সময় হলে দাম আরও বেশি হয়। এ চাষী আরো বলেন, তবে কলা একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য। গাছ থেকে পাড়ার পর বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। যদি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা লাভ করা সম্ভব হতো।

কলা চাষিদের মতে, উন্নতমানের বিশেষায়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং সংরক্ষণের টেকসই ব্যবস্থা থাকলে এই অঞ্চলের কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো। কিন্তু এসব না থাকায় হাট বাজার শুরু করে সবখানে ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট চক্রের কাছে অসহায় চাষিরা। তাদের দাবি, হাট কিংবা বাজারের কাছাকাছি বিশেষায়িত কালেকশন সেন্টার গড়ে উঠলে কিছুটা হলেও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমবে। 

ব্যবসায়ী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুর অঞ্চলে কলার আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারে।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, কলা এমন একটি চমৎকার ফল যা কাঁচা এবং পাকাÑউভয় অবস্থাতেই নানা পদের সুস্বাদু খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। কাঁচা কলা যেমন পুষ্টিকর সবজি, তেমনি পাকা কলা দিয়ে তৈরি করা যায় চমৎকার সব ডেজার্ট ও স্ন্যাঙ্। কলার মোচা পরিষ্কার করে কেটে আলু ও মশলা দিয়ে নিরামিষ তরকারি বা মাছ দিয়ে ঘণ্ট রান্না করা যায়, যা আয়রনের দারুণ একটি উৎস। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি উদ্যোগের সঠিক সমন্বয় ঘটলে রংপুর অঞ্চলের কলা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দখল-দূষণে ভরাট হচ্ছে ধলিয়া জলাশয়

1

নকল সার-কীটনাশক ব্যবসায়ীর কারাদণ্ড

2

১০ হাজার কোটি টাকার নতুন কৃষিঋণ তহবিল

3

‘নবীর ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচারের আলোকে দেশ পরিচালনার সর্

4

মাগুরায় কৃষকের কলাগাছ কেটেছে দৃর্বৃত্তরা

5

জয়পুরহাটে ১০ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা শুরু

6

চুয়াডাঙ্গায় আগাম জাতের বাঁধাকপিতে বিরল রোগ

7

বৃষ্টি না থাকায় ফসল বাঁচাতে সেচেই ভরসা

8

বরফ সংকটে সাগরে যেতে পারছে না মাছের ট্রলার

9

বগুড়ার সবজির চারা যাচ্ছে সারা দেশে

10

সুনামগঞ্জে হাঁস-মাছ-গরু চাষাবাদে কৃষকদের ভাগ্য বদলাচ্ছে

11

পান চাষে সাড়া ফেলেছে কৃষক রবিউল

12

বিষক্রিয়ায় দুই মহিষের মৃত্যু

13

বনে ফিরলো ২৪ পাখি

14

সোনামসজিদ দিয়ে এলো ১১৮ টন কাঁচা মরিচ

15

ময়মনসিংহে সেচ সহায়ক সরঞ্জামাদি বিতরণের উদ্বোধন

16

গ্রিসে স্ট্রবেরি খাতে বাংলাদেশিদের দাপট

17

১৮ ফুট অজগর উদ্ধার করে লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত

18

বাংলাদেশি কৃষি শ্রমিক নেবে ওমান

19

বান্দরবানে খাদ্য সংকটে গাইড-মাঝি

20