ময়মনসিংহ সংবাদদাতাঃ
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার খিরু নদী শিল্পবর্জ্যে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার অপরিশোধিত তরল বজ্য ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। এতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে পুরো নদীর পানি। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। বিপন্ন করে তুলেছে এলাকার পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে সবার চোখের সামনে এক সময়ের প্রবাহমান নদীতে ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু তাকে রক্ষার কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
জানা যায়,বালুকা উপজেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি এক সময় চলমান ছিলো। এই অঞ্চলের মানুষ এই নদী থেকে থেকে প্রচুর মাছ ধরতো। নদীতে মাছ ধরে জিবিকা নির্বাহ করতো স্থানীয় জেলেরাও। কালের পরিক্রমায় নদীটি ধীরে ধীরে রাট হতে চলেছে। ভালুকা উপজেলায় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শিল্পায়ন বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে উপজেলায় ছোট-বড় তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব অধিকাংশ কারখানার বর্জ্য খাল-নালা হয়ে খিরু নদীতে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে লাউতি খালসহ কয়েকটি প্রবাহপথে শিল্পবর্জ্য খিরুতে পৌঁছানোর কথা বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে।
পলি জমা ও দুই পার ভরাটের কারণে নদীটির গভীরতা ও প্রশস্ততা কমছে আশঙ্কাজনক হারে। তার সঙ্গে চলছে জবর-দখলের প্রতিযোগিতা। নাব্য হারানোর পাশাপাশি শিল্পকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্যে নদীর পানি মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হয়ে পড়েছে। আগে খিরু নদীতে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পানিপ্রবাহ বেশি থাকলেও বর্তমানে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাস মাঝারি আকারের পানি প্রবাহ থাকে। বছরের বাকি ৯ মাসই পানি প্রায় থাকে না। এই অবস্থায় নদীশাসন না করায় অস্তিত্বের সংকটে খিরু নদী।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খিরু নদীর সঙ্গে ভালুকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা রয়েছে। ১৯৮৮-৯২ সালে খিরু নদী উপ-প্রকল্পের আওতায় নদী ও খাল পুনর্খনন এবং পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। তারপর ২০২৩ সালে নাব্য ফিরিয়ে আনতে খিরু নদীর ভালুকা উপজেলাধীন রাজৈ ইউনিয়নের পারুলদিয়া গ্রাম থেকে মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার অংশ পুনর্খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল নামসর্বস্ব। খনন করা মাটি নদীর পাড় ও কোনো কোনো স্থানে নদীর ভেতরে ফেলে রাখার অভিযোগ ওঠে। ফলে বর্ষায় সেই মাটি আবার নদীতে গিয়ে পড়ায় প্রকল্পটি কোনো কাজেই আসেনি।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, নদীতে পানি কমে যাওয়ার সময় পানিতে কোনো ধরনের মাছ বাঁচে না, এসব দূষিত পানি কৃষিজমিতে ব্যবহারের ফলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ধামশুর গ্রামের কৃষক সেলিম খান অভিযোগ করেন, বর্তমানে খিরু নদীতে মোটামুটি পানি রয়েছে। এত পানি থাকা সত্ত্বেও এর রং বিবর্ণ ও পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একই অভিযোগ উপজেলার খারুয়ালী গ্রামের মোহাম্মদ আবুল হোসেন খানসহ নদীর দুপারের বাসিন্দাদের।
কাঁঠালি গ্রামের কৃষক হারুন ফকির, লাল মিয়া ও রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বর্জ্যরে প্রভাব আরও প্রকট হয়। কখনও পানির রং কালো, কখনও নীল রঙে পরিবর্তিত হয়। দুর্গন্ধও ছড়িয়ে পড়ে।
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন জানান, শিল্পের দূষিত বর্জ্য থেকে খিরু নদী রক্ষাসহ অন্যান্য ছোট বড় নদী, খাল ও নালা সংস্কার করে পানিপ্রবাহ চালু, শিল্পের অপরিশোধিত বর্জ্য নির্গত বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কাজ করছেন তারা।
কৃ/স/জয়