নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
হাওরাঞ্চলের ফসলহানি রোধে কৃষকদের জন্য ব্রি ধান-১১৮ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। এই ধান আগামী বোরো মৌসুমে ৫০টি উপজেলায় ৫ হাজার কৃষকের মধ্যে প্রদর্শনী খামারের ব্যবস্থা করা হবে। পরবর্তীতে এ জাতটি ব্যাপক আকারে চাষাবাদ করা হবে। কৃষি বিভাগ বলছে, ঠান্ডাসহিষ্ণু এ ধানের ফলনও বেশি। যা বন্যা আসার আগেই কৃষকের গোলায় উঠে যাবে ধান। ফলে এই জাতের ধান আবাদের ফলে হাওরে কৃষকের ফসলহানির দুঃখ ঘুচবে। এতে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরাঞ্চলের ৭ জেলায় কৃষকরা আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৫২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ টন চাল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি ২৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৯০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই ক্ষতি রোধে হাওরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় ব্রি সূত্র জানায়, ব্রি-১১৮ ধান আবাদের জন্য ২০২৬ সালের মে থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ মাসব্যাপী ৪ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বাজেটের একটি কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় তিন হাজার কৃষক ও ৪২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে আধুনিক চাষাবাদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ব্রি ২০১৪ সালে ব্রি ধান-২৮ এর সাথে ভুটান নামক ভুটানি ঠান্ডা সহিষ্ণু ধানের সংকরায়ণের পর সিঙ্গেল সিড ডিসেন্ট ভিত্তিক র্যাপিড জেনারেশন অ্যাডভান্সমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ফরওয়ার্ডিং ব্রিডিং প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন করা হয়েছে এ ধান। ব্রি গাজীপুর ও ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয় কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের ৩টি স্থানে কৃষকের মাঠে নির্বাচিত কৌলিক সারিটি পর পর ২ বছর ফলন পরীক্ষার পর বোরো ২০২২-২৩ মৌসুমে ব্রি গাজীপুর খামার, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের ১০টি স্থানে কৃষকের মাঠে আঞ্চলিক উপযোগিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। বোরো ২০২৩-২৪ মৌসুমে কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরের ৯টি স্থান এবং কন্ট্রোল সাইট হিসেবে ব্রি গাজীপুরে অভিযোজন দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। বোরো ২০২৪-২৫ মৌসুমে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি জাতের ফলন পরীক্ষায় (পিভিটি) সন্তোষজনক হওয়ায় চলতি বছরে ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় হাওরাঞ্চলে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয় এ ধান।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ১০টি স্থানের মধ্যে চারটি স্থানে চেক জাতের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ফলন হয়েছে। সামগ্রিকভাবে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৬.৭৭ টন, অপরদিকে চেক জাতের গড় ফলন ৬.৪১ টন।
ব্রি-১১৮ ধান জাত উদ্ভাবনকারী দলনেতা ব্রির হবিগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথি বিশ্বাস বলেন, হাওরে বোরো মৌসুমে ব্রি-৮১, ৮৮ ও ২৮ জাতের ধান চাষ হয়। এগুলো ১০ দিন আগে রোপণ করলে চিটা হয়ে যায়। ব্রি-১১৮ ঠান্ডাসহিষ্ণু হওয়ায় আগাম লাগালেও চিটা হবে না। আবার বন্যা হওয়ার আগেই কৃষক ঘরে তুলতে পারবে।
তিনি বলেন, ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত বীজতলায় চারা ফেলে ১৫-২০ নভেম্বরে রোপণ করে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কাটা যাবে। স্বাভাবিকভাবে এর জীবনকাল ১৪৫-১৪৮ ও ঠান্ডা পড়লে স্থানভেদে ১৫০-১৫৭ দিন। হেক্টর প্রতি ৬.৭৭ টন উৎপাদন হয়। উপযুক্ত পরিবেশে সাড়ে ৮ টনও হতে পারে। আগামী বোরো মৌসুমে ব্যাপকভিত্তিক প্রদর্শনীর জন্য হাওরের ৫০টি উপজেলার প্রতিটায় ১০০টা করে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হবে। আনুমানিক ২০ টনের মতো বীজ লাগবে। চলতি আমন মৌসুমে ব্রির বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে বীজ উৎপাদনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এক দেড় মাসের মধ্যে বীজ পাওয়া যাবে। আমরা নভেম্বরের শুরুতেই কৃষকের হাতে বীজ পৌঁছে দেব।
সাবেক কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, আমরা হাওরের ফসলহানির কথা চিন্তা করে শুধুমাত্র এ অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য ব্রি ধান-১১৮ অবমুক্ত করেছি। অক্টোবরে বীজতলা তৈরি করে নভেম্বরের শুরুতে এ ধান রোপণ করা যাবে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ফসল ঘরে তুলতে পারবে কৃষক। ধান কাটা হয়ে যাবে কিন্তু বর্ষা আসবে না। আগামী বোরো মৌসুমে হাওরের ৫০টি উপজেলায় ধানটির প্রদর্শনী প্লট হবে। এ জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একটি বাজেট।
বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের মোট ধানের ১৬-২০ শতাংশ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। ব্রি-১১৮ চাষাবাদ করলে ১০ শতাংশ উৎপাদন বাড়বে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কান্না বন্ধ করতে আমাদের চেষ্টা হয়তো সফল হবে।
কৃ/স/জয়