ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের ভিওসি ঘাটের বৃহৎ ধানের মোকামটি এখন নানা সমস্যায় ধুকছে। পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ এই ধানের মেকামে প্রতিদিন সাত জেলার লাখ লাখ মন ধান কেনা-বেচা হলেও এখানে নেই কোন অবকাঠামো। ফলে এখানকার ব্যবসায়ী আর বিক্রেতাদের প্রতিদিন নানাসমস্যর সন্মুখিন হতে হচ্ছে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের ভিওসি ঘাট। চারদিকে শ্রমিকদের হাঁকডাক, ধানভর্তি নৌকার ভিড় আর দরদামের কোলাহলে জমে ওঠে পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই ধানের মোকাম। মেঘনা তীরের এই বাজারে প্রতিদিন কেনাবেচা হয় প্রায় এক লাখ মণ ধান। কৃষিপণ্য বাণিজ্যের এই ব্যস্ত কেন্দ্র শুধু একটি মোকাম নয়; বরং পূর্বাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
ধানের এই প্রবাহকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক বলয়। আশুগঞ্জ মোকামকে ঘিরে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেই গড়ে উঠেছে প্রায় আড়াইশ চালকল। এসব মিল থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০ কোটি টাকার চাল বাজারজাত করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ধান ওঠানামা, পরিবহন, চালকল, গুদামজাতকরণ ও খুচরা বাণিজ্য— সব মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই মোকাম ঘিরে।
এই ধানের মোকামের সাথে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, বৃহৎ এই মোকাম নেই আধুনিক জেটি। ফলে নৌকা থেকে ধান ওঠানামার সময় প্রতিদিনই পড়তে হয় দুর্ভোগে। বর্ষা মৌসুম কিংবা ঝোড়ো আবহাওয়ায় নিরাপদে নৌকা ভেড়ানোর সুযোগ না থাকায় ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়ায় নদীতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় ব্যবসায়ীদের।
হাওরাঞ্চল থেকে ধান নিয়ে আসা শ্রমিকদের ভাষ্য, ধান বিক্রি করতে এসে অনেক সময় কয়েক দিন পর্যন্ত আশুগঞ্জে অবস্থান করতে হয়। কিন্তু থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে রাত কাটাতে হয় নৌকাতেই। খাওয়া-দাওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধার অভাবও নিয়মিত দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক জেটি, ব্যবসায়ীদের আবাসন কিংবা শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার নেই এখানে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও বছরের পর বছর দুর্ভোগ নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে মোকামের কার্যক্রম।
মোকামের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর বাণিজ্যিক পরিসরের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরাঞ্চলের অন্তত সাত জেলার ধান আসে আশুগঞ্জে। বিশেষ করে, কিশোরগঞ্জের নিকলী, মিঠামইন, ইটনা, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওর এলাকা থেকে নৌপথে ধান নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এখানে গড়ে উঠেছে বিআর২৮, বিআর২৯ এবং মোটা জাতের ধানের বড় বাজার।
নিকলী থেকে আসা ধান ব্যবসায়ী রমজান মিয়ার ভাষায়, ‘আমরা হাজার হাজার মণ ধান এখানে বিক্রি করতে আনি। কিন্তু নেই ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও।’ সরকারিভাবে জেটি নির্মাণ এবং ব্যবসায়ীদের থাকার ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
একই ধরনের ভোগান্তির কথা বলছেন শ্রমিকরাও। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক এ মোকামে কাজ করলেও তাদের জন্য নেই বিশ্রামাগার কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। সারা দিন কায়িক শ্রমের পর অনেককেই খোলা স্থানে কিংবা নৌকায় বসে বিশ্রাম নিতে হয়। স্থানীয়দের মতে, একটি আধুনিক বিশ্রামাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেছেন, ‘মোকাম সম্প্রসারণ এবং শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের।’ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
কৃ/স/জয়