কঙ্বাজার সংবাদদাতাঃ
সাগরে মাছ ধরে লাভবান হতে পারছে না জেলেরা। একদিক সাগরে কাঙ্খিত মাছ নেই। অন্যদিকে যা পাওয়া যাচ্ছে তা বিক্রি করে জেলেদের মজুরি, জ্বালানি, খাবার, বরফ ও ট্রলারের অন্যান্য খরচ মেটাতেই পুরোটা শেষ। এমন অবস্থায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন সাগারে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিতো জেলে,মাঝি.মাল্লা,জাল,নৌকা মালিকদের।
মহেশখালীর কুতুবজোমের মাঝি মাল্লারা মাছ ধরতে ৯ দিন সাগরে ছিলেন। তাদের জালে উঠেছে হাজারখানেক ছোট-মাঝারি ইলিশ। সঙ্গে আরও কিছু মাছ। সব মিলিয়ে মাছ বিক্রি কওে তারা পেয়েছেন ৪ লাখ টাকা। শুনতে অঙ্কটা বড় মনে হলেও জ্বালানি,বরফ,সহ সব খরচ মিটিয়ে তাদের হাতে কোন টাকায় থাকেনি। এমনটাই জানাচ্ছিলেন নৌকার মাঝি এনাম। তিনি জানান,প্রথম মাসে কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও পরের দুই মাস ধরে লোকসান গুনছেন। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজ না জানায় লোকসান হলেও সাগরে যেতে হয় তাকে। ব্যর্থতার দায় মেনে নিয়ে এক ট্রলারের কাজ ছেড়ে আরেক ট্রলারে উঠে জীবিকার সন্ধান করতে হয়।
একই এলাকার জেলে ইদ্রিস জানান,মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার পর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। এ মৌসুমে তুলনামূলক ছোট আকারের ‘আল্লাহর দান’ ট্রলারটি সাগরে নামাননি।
সাগরে মাছ ধরতে গেলে সাধারণত ৭ থেকে ২১ দিন থাকার প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অনেক ট্রলারকে দুই-তিন দিনের মধ্যেই ফিরতে হচ্ছে। একেকটি ট্রিপে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হলেও মাছ উঠছে কখনো ২০ হাজার, কখনো ১ লাখ টাকার।
এফবি আল্লাহ মালিক ট্রলারের জেলে আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা ১০ দিনের জন্য সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় মাত্র তিন দিনের মাথায় ফিরে আসতে হয়েছে। মালিক ৪ লাখ টাকা খরচ করে ট্রলার পাঠিয়েছেন, কিন্তু আমরা মাত্র ৫০টি মাছ নিয়ে ফিরেছি।
এমন অবস্থা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া প্রায় প্রতিটি ট্রলারের। সাগরে ট্রলার নামালেই গুনতে হচ্ছে লোকশান। ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে মালিকরা ট্রলার নামাচ্ছেন না। ফলে বেকার বসে সময় কাচ্ছেন জেলে সহ মাঝি মাল্লারা।
কঙ্বাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ অবতরণ হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে, ১১ হাজার ১৭ টন। এরপর থেকেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। সর্বোচ্চ অবতরণের বছর ২০১৯-২০ এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৬ হাজার ২১১ টন তুলনা করলে ৪ হাজার ৮০৬ টন বা ৪৩ দশমিক ৬২ শতাংশ মাছ অবতরণ কমেছে।
কঙ্বাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেছেন, বর্ষাকালে লঘুচাপ, নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় তীব্র বাতাস, বৃষ্টিপাত ও সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। এ কারণে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়। তার ভাষ্য, ৩ নম্বর সংকেত দেওয়া হলে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে দ্রুত উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে চলে আসতে হয়।
কঙ্বাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ৪০ থেকে ৬০ ফুট দীর্ঘ কাঠের ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে যায়। এসব ট্রলারে সাধারণত ১৪০ থেকে ২৯০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন থাকে। বড় একটি ট্রলারে ২০-৩০ এবং মাঝারি ট্রলারে ১৫-২২ জন পর্যন্ত জেলে থাকেন। তিনি জানালেন, সামনে মা ইলিশ সংরক্ষণ মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে প্রতি বছর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে ভিত্তি করে নির্ধারিত সময় সাধারণত অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কঙ্বাজার সামুদ্রিক কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রাসহ নানা ধরনের দূষণ বাড়ছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও সাগরে দূষণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, সাগরে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের দূষণে মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কিছু জালের ব্যবহার ডিম-পোনা ও মাছ নিধনে ভূমিকা রাখছে।
কৃ/স/জয়