কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 16, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

হাওরে মিলছে না দেশি মাছ

নেত্রকোনা সংবাদদাতাঃ 
নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখন ক্রমেই দেশি মাছশূন্য হয়ে পড়ছে।  একসময় যার পরিচিতি ছিল দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়ারণ্য হিসেবে, সেখানে মিরছে না দেশি প্রজাতির মাছ। স্থানীয় জেলেওে হাওর সহ নদী-নালা,খাল-বিলে জাল ফেলে দিন শেষে খালি হাতে ফিরছেন। এমন অবস্থায় তাদের এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। 

আজ থেকে মাত্র ছয় দশক আগেও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে অন্তত ১১৫ প্রজাতির বৈচিত্র্যময় দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু মানবসৃষ্ট ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সেই বিপুল ভাণ্ডার থেকে ইতোমধ্যে ২৯ প্রজাতির মাছ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে যেখানে মাত্র ৬১ প্রজাতির মাছের দেখা মেলে, তার মধ্যেও বাকি থাকা প্রজাতিগুলোর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ভয়াবহ। বর্তমানে অবশিষ্ট মাছের মধ্যে ৪৩টি প্রজাতি বিপন্ন, ১১টি চরম বিপন্ন এবং আরও ১২টি প্রজাতি তীব্র সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রজননের সুযোগ না পাওয়া এবং প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার এমন উচ্চহার হাওরের জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

মাছের চরম সংকটে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও লোকসানের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। অব্যাহত লোকসান এবং জীবন-জীবিকার কঠোর বাস্তবতায় টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ছেড়ে দিয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।

নেত্রকোণার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ী ও কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চল ঘুরে জেলেদের দুর্দশার করুণ ছবি চোখে পড়ে। মদন উপজেলার প্রবীণ জেলে ওয়াহাব মিয়া (৭০) দীর্ঘ ছয় দশক ধরে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্ষায় হাওরের জলে জাল ফেলা আর শুকনো মৌসুমে কৃষিশ্রমিক হিসেবে ধান কাটার কাজই তার জীবনের মূল সঞ্চয়। তবে বয়সের শেষপ্রান্তে এসে তিনি হাওরের এমন অভূতপূর্ব মৎস্য সংকট আগে কখনো দেখেননি। চার সদস্যের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে এখন তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের জলজ প্রতিবেশ ও মৎস্যসম্পদ আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে দেশীয় স্বাদু পানির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে গবেষণা সংস্থা ‘বারসিক’-এর সাম্প্রতিক তথ্যে।

হাওরের জেলেদের অভিযোগ, মাছ ধরা পড়ুক আর না পড়ুক, প্রতিদিন নৌকা চালানো, জ্বালানি তেল ও জাল মেরামতের পেছনে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা খরচ করতেই হয়। সারাদিন হাওরের জলে ঘুরে কাঙ্ক্ষিত মাছ না মেলায় খরচের টাকাই উঠছে না। ফলে উল্টো নিজেদের জমানো মূলধন হারিয়ে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন তারা। এ কারণে বাধ্য হয়ে অনেকেই পেশা বদলে দিনমজুরি বা খেতমজুরের কাজ বেছে নিচ্ছেন।

মৎস্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিত ও নির্বিচার মৎস্য আহরণ, বর্ষার মৌসুমে প্রজননক্ষম ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা ধ্বংস করাই এই সংকটের প্রধান কারণ। চীন থেকে আসা অত্যন্ত ক্ষতিকর ‘চায়না দুয়ারী’ ও ‘মিহি ফাঁস’র কারেন্ট জালের বেপরোয়া ব্যবহারে বড় মাছের পাশাপাশি রেণু ও পোনা মাছও নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া কিছু অসাধু লোক বিষাক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল, গ্যাস ট্যাবলেট এবং বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ শিকার করছে। পাশাপাশি কৃষিজমিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে সরাসরি হাওর ও বিলে মিশে মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করছে।

হাওরে মাছের এই অভাবের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতেও। হাওর থেকে দেশীয় মাছের যোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা। এখন আড়ত ও বাজারের দেশীয় মাছের অভাব মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা খামারের মাছের ওপর। কেনাবেচা কমে যাওয়ায় শুধু জেলেই নন, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত শত শত ব্যবসায়ী ও শ্রমিক জীবিকার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

একসময় নেত্রকোণা জেলায় ১৩৫টি হাওর, ৮২৪টি বিল, ১১৫টি নদী এবং ৪৩৯টি প্রাকৃতিক খাল ছিল বলে সরকারি নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে পলি পড়ে ভরাট হওয়া, অবৈধ দখল ও জলাশয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে মাছের স্বাভাবিক আবাস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমানের মতে, অবিলম্বে প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর পন্থায় মাছ ধরা বন্ধ করা না গেলে অবশিষ্ট প্রজাতির দেশীয় মাছও চিরতরে হারিয়ে যাবে।
নেত্রকোনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ জানান, দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী সংরক্ষণে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে মদন এবং খালিয়াজুরী উপজেলায় মাছের কোনো সরকারি অভয়াশ্রম নেই। তবে নতুন অভয়াশ্রম স্থাপনের জন্য অলরেডি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব ও আবেদন পাঠানো হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত জালের ব্যবহার বন্ধে এবং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষায় আইনি নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আগাম শিমে বাড়তি লাভের আশা কৃষকদের

1

পাহাড়ের পাশে বর্জ্যর স্তুপ

2

ইলিশের আকাল খুঁজতে মাঠে বিশেষজ্ঞ দল

3

২শ’বছরেও হয়নি কেল্লাঃ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় মহিষ

4

সিসা দূষণ নির্মূলে জাতীয় কৌশলপত্র চূড়ান্ত করছে সরকার

5

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে আইসিসিসিএডির সমঝোতা স্মারক সই

6

সাব-ডিলারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা

7

পার্টনারসহ ডিএইর তিন প্রকল্পে নতুন পিডি

8

জলবায়ু প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর টিকে থাকা কঠিন

9

শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি: তাহিরপুরে বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্

10

৩৭শ’ কুমির নিয়ে বিপাকে ভালুকার খামার

11

সমুদ্রে ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বেড়েছে

12

হাওরের শিক্ষার্থীদের জন্য নৌকা বিতরণ

13

বৈদ্যেরবাজারে দেশি মাছের জমজমাট কেনাবেচা

14

প্রতি হেক্টরে ধান হবে ১৫ টন, গবেষণা করছে এসিআই

15

২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু

16

গাসিকের বর্জ্যে বিপন্ন তুরাগ নদ

17

হিলিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা

18

বান্দরবানে পহাড়ধস বন্যায় বিপর্যস্ত জনজীবন

19

কীটনাশক আমদানি, ব্যবহার ও বিক্রিতে নতুন নীতিমালা হচ্ছে

20