গাজীপুর জেলা প্রতিনিধিঃ গাজীপুর মাহনগর। শিল্প কারখানা আর ইট পাথরের শহরের পাশেই রয়েছে প্রাণ প্রকৃতিতের ভরপুর এক বিল । নাম তার বেলাই। গাজীপুর সদর উপজেলার খুদে বর্মী, দিগধা, বলধা, পাড়াগাঁও, কেশোরীতা, আতুড়ি, বাড়িয়া ও রেওলা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এ বিলের বিস্তৃতি।
প্রচলিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে এ বিলটির নামকরণ হয়। বলা হয়, পড়ন্ত বেলায় সূর্যাস্তের রঙিন আলো যখন বিলের জলে প্রতিফলিত হয়ে অপূর্ব এক দৃশ্যের জন্ম দিত, তখন সেই দৃশ্যের অনুপ্রেরণাতেই এর নাম রাখা হয় ‘বেলাই বিল’। এই বিলে ভাওয়াল রাজা রনেন্দ্র নারায়ণ রায় এবং গাজী বংশের জমিদাররা এখানে নৌকাবাইচের আয়োজন করতেন। মাছ শিকার ছিল তাদের অন্যতম বিনোদন। প্রবীণদের ভাষ্য, স্বভাবকবি গোবিন্দ চন্দ্র দাসও বেলাই বিলের পাড়ে বসে বহু বিকেল কাটিয়েছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যেই লিখেছেন তাঁর অনেক কবিতা
বর্ষায় এ বিল প্রাণ ফিরে পায়। মাছ, শাপলা, নৌকা ও সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠেছে গাজীপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। বেলাই বিল মিঠাপানির দেশীয় মাছের অন্যতম আধার। রুই, কাতলা, শিং, মাগুর, টেংরা, কৈসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে এখানে। বিলপাড়ের বহু পরিবার মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গাজীপুর শহরের পূর্ব দিক থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ি, নুরুন, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মরাশ, আওড়াখালী ও আজমতপুর এলাকা পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বিস্তৃত হয়েছে এই বিল। একসময় বেলাই বিলে প্রবল স্রোত ছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেই স্রোত আজ অনেকটাই ক্ষীণ হলেও বিলের প্রাণচাঞ্চল্য কমেনি
প্রতিদিন ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই এই বিল লাল-সাদা শাপলা ফুলে ঢেকে যায়। এলোমেলো বাতাসে দুলতে থাকা শাপলার ভিতর দিয়ে ভেসে চলে ছোট ছোট নৌকা। বিলে দেখা মেলে কোথাও জেলে জাল ফেলছেন, কোথাও কৃষক নৌকা বেয়ে যাচ্ছেন নিজের জমিতে। আবার বিকেলের শেষ আলোয় সূর্যের সোনালি আভা জলে মিশে তৈরি করে এক ভিন্ন দৃশ্য। প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে সাজায় গাজীপুরের বেলাই বিলকে।
বিল সংলগ্ন বাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান খান জানান, বর্ষা মৌসুমে এই বিলই অসংখ্য মানুষের আয়ের প্রধান অবলম্বন। একই গ্রামের জিন্নাত আলী বলেন, সুস্বাদু দেশীয় মাছের টানে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। তবে শুধু মাছ নয়, বেলাই বিলের আরেকটি বড় আকর্ষণ লাল-সাদা শাপলার সমারোহ। বর্ষার সময় বিলের বিশাল অংশজুড়ে ফুটে থাকা শাপলা যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রপট। এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই আসেন প্রকৃতিপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও আলোকচিত্রীরা। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয় বিলের নৈসর্গিক রূপ।
বিলের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপের মতো গ্রামগুলোও এই অঞ্চলের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে নিজস্ব নৌকা। নৌকাই তাদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকার আনাগোনায় মুখর থাকে পুরো বিল। শুকনো মৌসুমে পানি সরে গেলে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুরু হয় বোরো ধানের আবাদ। সবুজ ধানের মাঠে ফিরে আসে কৃষকের ব্যস্ততা।
বেলাই বিলের মানুষের জীবনে রয়েছে প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ। বর্ষাকালে তারা সচেতনভাবেই পোনা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন, যাতে মাছের বংশবিস্তার অব্যাহত থাকে। পরে পানি কমে এলে উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই মিলে মাছ ধরেন। এই ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বেলাই বিল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতি ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ জন্য সরকারের সময় উপযোগী পদক্ষেপ দরকার।