স্টাফ রিপোর্টরঃ রাজধানীর গাবতলীতে দেশের প্রথম ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট উদ্বোধন করেছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ। বাংলাদেশের আম রফতানিতে দীর্ঘদিনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল আন্তর্জাতিক কোয়ারেন্টাইন মানদণ্ড পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় স্বীকৃত ট্রিটমেন্ট সুবিধার অভাব। এবার তা দুর করতেই ভিএইচটি প্লান্ট চালু করা হলো। এ প্রযুক্তি চালুর ফলে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও নিউজিল্যান্ডের মতো কঠোর কোয়ারেন্টাইন নীতিমালা অনুসরণকারী দেশগুলোতে বাংলাদেশের আম রফতানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) স্থাপিত ভিএইচটি সেন্টারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি উপদেষ্টা বলেন, কৃষিপণ্য রফতানির সব ধরনের প্রক্রিয়া সহজ করতে গাবতলীর ভিএইচটি সেন্টারে আগামীকাল মঙ্গলবার) থেকেই কোয়ারেন্টাইন অফিস চালু হবে। ফলে রফতানিকারকেরা একই স্থানে কৃষিপণ্য ধোয়া, ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট, প্যাকেজিং এবং কোয়ারেন্টাইন সম্পন্ন করে সরাসরি বিমানবন্দরে পাঠাতে পারবেন। তিনি বলেন, রফতানির ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা হচ্ছে, যাতে সময় ও ব্যয় দুটোই কমে আসে।
কৃষি মন্ত্রী জানান, বিমানবন্দরে রফতানিযোগ্য ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া রফতানি ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি এবং আগাম কার্গো স্পেস সংরক্ষণের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
জানা যায়, ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট একটি রাসায়নিকমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সাহায্যে ফলের মাছি এবং অন্যান্য কোয়ারেন্টাইনভুক্ত ক্ষতিকর পোকামাকড়, তাদের ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা হয়। এতে আম, পেঁপে এবং অন্যান্য ফলের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখেই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিরাপদ করা সম্ভব হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্ল্যান্টটি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১২ টন আম প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। প্রতি কেজি আম প্রক্রিয়াজাতে খরচ হবে মাত্র তিন টাকা। এখানে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারভিত্তিক আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত মূল্য পান না। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি রফতানি বৃদ্ধি এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি জানান, শুধু আম নয়, লিচু, কাঁঠাল, বরই, টমেটো, পেঁপে, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যও ভবিষ্যতে এই ভিএইচটি সেন্টারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে কিছু কাঁঠাল নিয়েছে। পাশাপাশি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহী। এসব বাজারে প্রবেশের জন্য বিশ্বমানের প্যাকেজিং, কোয়ারেন্টাইন ও ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্লোবালজিএপি (এখঙইঅখ এ.অ.চ.)-এর প্রশিক্ষক এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, ভিএইচটি প্রযুক্তির প্রবর্তন বাংলাদেশের আম রফতানি শিল্পের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের ফল আমদানির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কোয়ারেন্টাইন শর্ত রয়েছে। ভিএইচটির মাধ্যমে আম কোয়ারেন্টাইনভুক্ত ক্ষতিকর পোকামাকড়মুক্ত হয় এবং কঠোর মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, ভিএইচটি শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের আমকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও কানাডাসহ ২৭টি দেশে মূলত প্রবাসীকেন্দ্রিক বাজারে আম রপ্তানি করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সুপারমার্কেট চেইন এবং উচ্চমূল্যের ফলের বাজারে প্রবেশ এখনও সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিএইচটি প্রযুক্তি চালুর ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরেই ভিএইচটি, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি এবং আধুনিক প্যাকহাউস ব্যবহার করে আসছে। এসময় কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ,বিএডিসির চেয়ারম্যান, বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং ডিএই’র মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।